ভাষা আন্দোলন

১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণ না করে, পূর্ব বাংলার নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। এই নীতির অংশ হিসেবে তারা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। যেখানে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬ শতাংশ লোক বাংলা এবং মাত্র ৭.২ শতাংশ লোক উর্দু ভাষায় কথা বলে, সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অর্থই ছিল বাঙালি জনগণকে দাবিয়ে রাখা। প্রাসঙ্গিক কারণেই এখানে যদি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর সমগ্র পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষার পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হচ্ছে-

বাংলা ভাষায় কথা বলতো মোট ৪ কোটি ১২ লাখ ৯১ হাজার ৮৮৯ জন লোক, যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬ শতাংশ। উর্দুতে কথা বলতো মাত্র ৫৪ লাখ ১৯ হাজার ১৩১ জন, যা মোট জনসংখ্যায় মাত্র ৭.২ শতাংশ। পশতুতে কথা বলতো  ৩৫ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৬ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৭.১ শতাংশ। বেলুচ ভাষাভাষির সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৯৯৯ জন, যা শতকরা ১.৪ শতাংশ। সিন্ধিতে কথা বলতো ৪৩ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৭ জন, যা মোট মানুষের ৫.৮ শতাংশ। পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলতো ২ কোটি ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮১৫ জন, যা মোট জনসংখ্যার ২৮.৪ শতাংশ। এছাড়াও ইংরেজি ভাষাভাষির সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫৬৭ জন, যা শতকরা হিসেবে ১.৮ শতাংশ।

বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি। যথা:

প্রথমত, পূর্ব বাংলার জনগণকে নেতৃত্বশূন্য ও আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা। কারণ, বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে বাঙালি জনগণকে চাকরি তথা প্রশাসনে অংশগ্রহণের জন্য একটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার বোঝা বহন করতে হতো। এতে করে বাঙালির স্বাভাবিকভাবেই অবাঙালিদের থেকে পিছিয়ে পড়তো।

দ্বিতীয়ত, পূর্ব বাংলার জনগণ বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিল। তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য গর্ববোধ করতো। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ছিল তাদের আদর্শ, চেতনা, মূল্যবোধ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের এমন বাঙালি সংস্কৃতি প্রীতিকে সন্দেহের চোখে দেখতো। তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে হিন্দুদের সংস্কৃতি বলে মনে করতো। তারা আরও মনে করতো যে, পূর্ব বাংলার জনগণের এ ধরনের সংস্কৃতি চর্চা ভারতের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।

মোটকথা, পূর্ব বাংলার জনগণের বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে তাদের নেতৃত্বশূন্য এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং এই ষড়যন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলামীকরণের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

মুজিবের ঢাকায় ফেরা

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা পূর্ব বাংলাকে ইসলামীকরণের অংশ হিসেবে নিত্য ব্যবহার্য খাম, ডাকটিকিট, রেলগাড়ির টিকিট, বিভিন্ন ধরনের ফরম প্রভৃতিতে বাংলা ব্যবহার বন্ধ করে দেয় এবং তার স্থলে ইংরেজি ও উর্দুর ব্যবহার শুরু করে। দেশভাগের আগেই কট্টর মুসলীম লীগ নেতা ও ভবিষ্যত সরকারের  মনোভাব সম্পর্কে অনুমান করতে পেরেছিলেন মুসলীম লীগেরই প্রগতিশীল ছাত্রনেতারা। তাই জুলাই মাসেই এসব ছাত্রনেতা 'গণ আজাদী লীগ' নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিব কলকাতার রাজনৈতিক জীবন শেষ করে ঢাকায় ফেরেন এবং ১৫০ মোগলটুলীতে ওঠেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে। এসময় তাজউদ্দিনের সাথে তার যোগাযোগ হয়। তাজউদ্দিন সে সময় গণ আজাদী লীগের কার্যক্রমের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। শেখ মুজিবও এর সাথে যুক্ত হন। পরবর্তীতে (১৯৫০) অবশ্য এই সংকলনটি 'সিভিল লিবার্টিস লীগ' নামে আত্মপ্রকাশ করে।

এসময় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করলে, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখে এর প্রতিবাদ করেন।

গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন

ভারত বিভক্তির পূর্বেই মুজিব মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক ও সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতি আস্থা হারিয়েছিলেন। তিনি পরিষ্কার উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম লীগের সাথে থেকে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই মাউন্টব্যাটেনের ৩ জুন পরিকল্পনা ঘোষণার সাথে সাথে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সিরাজুদ্দৌলা হোস্টেলে ছাত্র ও যুব নেতাদের নিয়ে এক রুদ্বদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন এবং পূর্ব বাংলায় লীগ বিরোধী ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আর এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারত বিভাগের পরপরই তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকায় মুসলিম লীগ বিরোধী ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন।

ফলশ্রুতিতেই প্রদেশব্যাপী প্রস্তুতির পর শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমেদ, শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমেদ, শামসুদ্দীন আহমেদ, তসাদ্দক আহম্মেদ প্রমুখের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গঠিত হয় পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ।  যুবলীগ নবগঠিত পাকিস্তানের গণতন্ত্র, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও ভাষা বিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। উক্ত প্রস্তাবে বলা হয়- বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।

উল্লেখ্য যে, এসময় (১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রের সমন্বয়ে তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম। সংগঠনটি ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এতে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করার দাবি জানানো হয়। ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে তমদ্দুন মজলিশের ভূমিকা বেশ সক্রিয় হলেও, ভাষার দাবিতে আন্দোলনের সাথে সাথে বাঙালি সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রকট হতে থাকলে এই সংগঠনটি নিষ্ক্রিয় হতে থাকে। শেখ মুজিবও রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বহু কাজে এই সংগঠনটিকে সাহায্য ও সমর্থন করেছেন।

প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন

১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচীতে যে শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। আর এই সংবাদ ঢাকায় এসে পৌছলে শিক্ষিত সম্প্রদায় বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়। তার পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বাংলা ভাষা বিরোধী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত হয় এবং এর প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সভা আহ্বান করে। তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে মুসলিম ছাত্রলীগ, গণতান্ত্রিক যুব লীগ ও তমদ্দুন মজলিশের সমন্বয়ে গঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এর আহ্বায়ক নিযুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া।

এই কমিটির উদ্যোগে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই বাংলা ভাষার দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর অভিযান শুরু হয় এবং কয়েক হাজার মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে সেটি সরকারের কাছে পাঠায়। উল্লেখ্য যে এই স্বাক্ষর অভিযানে অন্যান্যদের সাথে শেখ মুজিবও অংশগ্রহণ করেন এবং সেজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা

তৎকালীন সময়ে, গণতান্ত্রিক যুবলীগের পরপরই যে ছাত্র সংগঠনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে- সেটি হলো পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। এটি ছিল তখন পূর্ব বাংলায় একমাত্র সরকার বিরোধী সংগঠন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগই হল তখন প্রথম ছাত্র সংগঠন যে সংগঠনটি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এক্ষেত্রে তিনি তার কলকাতার ছাত্রজীবনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। যাই হোক, নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই নেতা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান ও শেখ মুজিবুর রহমান। শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ও মুসলিম লীগ সরকারের কট্টর সমর্থক। অপরদিকে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার অনুসারী এবং মুসলিম লীগ সরকারের ঘোর বিরোধী। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও মুসলিম লীগ নেতাদের উপনিবেশিক আচরণ, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রভৃতি উপলব্ধি করে সরকার বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি অসাম্প্রদায়িক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে এক কর্মীসভায় গঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। নবগঠিত এই সংগঠনটিতে শুধুমাত্র কৌশলগত কারণেই 'মুসলিম' শব্দটি ব্যবহার করা হয় পরবর্তীকালে শেখ মুজিব মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটি ছিল নিম্নরূপ:

১. নঈমুদ্দীন আহমদ, ২. আব্দুর রহমান চৌধুরী (বরিশাল), ৩. শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর) ৪. অলি আহাদ (কুমিল্লা), ৫. আজিজ আহমদ (নোয়াখালী), ৬. আবদুল মতিন (পাবনা), ৭. দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), ৮. মফিজুর রহমান (রংপুর), ৯. শেখ আব্দুল আজিজ (খুলনা), ১০. নওয়াব আলী (ঢাকা), ১১. নুরুল কবির (ঢাকা), ১২, আব্দুল অজিজ (কুষ্টিয়া) ১৩. সৈয়দ নূরুল আলম ও ১৪. আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করা। এই সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং নেতাকর্মীরা ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনে পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সাথে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব করেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। এরপর পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনও এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবটি নিয়ে গণপরিষদে তুমুল বিতর্ক হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়।

গণপরিষদের এই বাংলাভাষা বিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ধর্মঘট চলাকালীন ঢাকার ছাত্র সমাজ বাংলা ভাষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করে। আর এই মিছিলের পুরো ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এসময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সরকার বিরোধী একমাত্র ছাত্র সংগঠন হওয়ার সুবাদে ভাষা আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে চলে আসে। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভা আহ্বান করা হয় । কামরুদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, রনেশ দাসগুপ্ত, অজিত গুহ, আবুল কাসেম, কাজী গোলাম মাহবুব, নঈমুদ্দীন আহমেদ, শহীদুল্লাহ কায়সার, তাজউদ্দিন আহমদ, শওকত আলী, সরদার ফজলুল করিম, শামসুদ্দীন আহমদ, তফাজ্জল আলী প্রমুখ।

এই সভায় পূর্ববর্তী সংগ্রাম পরিষদ বিলুপ্ত করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণ আজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, তমদ্দুন মজলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সংসদের দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে গঠন করা হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি সর্বদলীয় পরিষদ। পরিষদ ১১ মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে এবং তা সফল করার জন্য ব্যাপকভাবে পিকেটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়।

শেখ মুজিবের কারাবরণ

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ, সকালেই ধর্মঘট সফল করার জন্য ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে অবস্থান গ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী প্রমুখ সেক্রেটারিয়েটের পাশে পিকেটিং-এর জন্য অবস্থান নেয়। শেখ মুজিবুর রহমান সেক্রেটারিয়েটের ১ নং গেটে (আব্দুল গনি রোড) অবস্থান নেন। সেখানে পুলিশ অফিসার শামসুদ্দোহার সাথে শেখ মুজিবের উত্তপ্ত তর্ক বিতর্ক হয় এবং এক পর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গিয়ে দাঁড়ায়। শেষপর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

১১ মার্চের এই ধর্মঘট শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের পথিকৃত ছিল এই দিনটি। পরবর্তী কয়েকদিন মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে ছাত্র সমাজ। তীব্র আন্দলনের মুখে ১৫ মার্চ সরকার সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখ মুজিবসহ অন্যান্য ছাত্রনেতাকে একটি ট্রাকে করে সারা শহর প্রদক্ষিণ করানো হয় এবং সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

১৬ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব সেই নির্ধারিত ছাত্রসভায় উপস্থিত হলে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে সভায় সভাপতিত্ব করার অনুরোধ জানান। শেখ মুজিব তাতে রাজি হন এবং তার সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু হয়।

এই আন্দোলনে শুধু ছাত্র সমাজই নয়, ছাত্রনেতাদের বিশেষ করে শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে ৭৬ বছরের বৃদ্ধ শেরে বাংলা একে ফজলুল হকও  প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলনে অংশ নেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন।

মোহাম্মদ আলীর জিন্নাহর ঢাকা আগমন

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ জিন্নাহ বিকেলের দিকে ঢাকা এসে পৌঁছান। এরপর ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণদানকালে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে বলেন- একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, যারা এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছেন তারা বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থভোগী চর তথা পাকিস্তানের শত্ৰু। জিন্নাহর এই বক্তব্যের পর ছাত্ররা 'না' 'না' বলে প্রতিবাদ করে। আর ছাত্র সমাজের এই সমবেত প্রতিবাদেও নেতৃত্ব প্রদান করেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ ও আব্দুল মতিন।

২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলে আবারো গর্জে উঠল ছাত্ররা। এই সমাবর্তনে জিন্নাহ আবারও 'একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' বলে ঘোষণা দিলে ছাত্রদের 'না', 'না' প্রতিবাদের তীব্র স্বর শুনে জিন্নাহর কণ্ঠস্বর ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু মুসলিম লীগের অব্যাহত ষড়যন্ত্র এবং সরকারের দমননীতির কারণে সরকার শেখ মুজিবকে ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ করে। এরপর তমদ্দুন মজলিস মুসলিম লীগের সঙ্গে আপসকামিতার কারণে বিলীন হয়ে যায়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ১৯৪৯ সালে আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করলে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এর জোরালো প্রতিবাদ করে।

শেখ মুজিব: ছাত্রনেতা থেকে জননেতা

শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার প্রায় একমাস পর অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে জেলখানা থেকে মুক্তি লাভ করেন। জেলখানা থেকে বের হয়েই তিনি ভাষা আন্দোলনসহ পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনে শরীক হন। ২৯ জুলাই তিনি নারায়ণগঞ্জে এক সাংগঠনিক সফরে যান এবং সেখানে ছাত্রলীগের প্রকাশ্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতায় তিনি ছাত্রলীগের ১০ দফার অন্যতম দাবি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর করাচি থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরের দাবি জানান।

এছাড়া ১৯৪৮-৫০ সালে পূর্ব বাংলায় খাদ্য সংকটের ফলে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাতে প্রায় ২০ হাজার লোক গ্রাণ হারায়। এই দুর্ভিক্ষর প্রতিবাদে শেখ মুজিব আন্দোলন গড়ে তোলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে ঢাকা সফরে আসেন এবং ওঠেন 'বর্ধমান হাউসে'। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শেখ মুজিব বিক্ষোভ কর্মসূচি জোরদার করেন এবং আরমানিটোলা ময়দানে এক বিশাল জনসভায় তিনি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। জনসভা শেষে প্রায় ৫০ হাজার লোকের এক বিশাল মিছিল নিয়ে মুজিব বর্ধমান হাউসের দিকে অগ্রসর হলে নবাবপুর রেলক্রসিং-এ পুলিশ মিছিলে বাধা প্রদান ও লাঠি চার্জ করে। মিছিল থেকে মাওলানা ভাসানী ও শামসুল হককে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিব আত্মগোপনে থেকে সারা বাংলায় জেলা ও মহকুমা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোতে খাদ্যের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি জোরদার করেন। কিন্তু আবারও তিনি মুসলিম লীগ সরকারের কোপানলে পড়েন এবং ১৯৫০ সালে ১ জানুয়ারি গ্রেফতার হন।

মওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে ১৯৫০ সালের জুন মাস নাগাদ মুক্তি দেওয়া হলেও সরকার শেখ মুজিবকে জেলখানার অন্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে রাখে। শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় তিনি জেলখানায় আটক থাকলেও একেবারে বসে থাকেননি। ভাষা আন্দোলনসহ সরকার বিরোধী অন্যান্য আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত কালপর্ব

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনিও জিন্নাহ ও লিয়াকত আলীর মতো করেই ঘোষণা করেন যে- উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায়ও তিনি একই ঘোষণা দেন। নাজিমুদ্দিনের এমন ঘোষণায় ঢাকার ছাত্র সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিনে এক জরুরি সভার আয়োজন করে। ৩০ জানুয়ারি হরতাল পালন করা হয়।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ গঠন

এমতাবস্থায় ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, খেলাফতে রব্বানী পার্টি, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ মোট ৬২ সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ।

একুশে ফেব্রুয়ারি হরতাল

ঢাকায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। হরতাল শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক বিশাল ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি সার পূর্ব বাংলায় হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে একমাসের জন্য ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি এবং সকল প্রকার মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই ঘোষণায় ঢাকার ছাত্র সমাজ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্ররা জমায়েত হতে শুরু করে। বেলা ১১টারপর আমতলায় সভা শুরু হয়।

সভা শেষে তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ পার হয়ে কলেজ হোস্টেলের দিকে এগুতে শুরু করলে পুলিশ মিছিলে লাঠি চার্জ শুরু করে। পুলিশের সাথে শুরু হয় ছাত্র জনতার খণ্ডযুদ্ধ। এরপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছাড়লে ছাত্ররা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে। এরপর ছাত্র-জনতা পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। লাঠি চার্জ কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে থাকলে ছাত্র-জনতাও ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। এভাবে পুলিশ ছাত্র-জনতা খণ্ডযুদ্ধ বিকেল পর্যন্ত চলে। এরপর বিকাল ৩টার দিকে পুলিশ প্রথম গুলিবর্ষণ করে। বরকত-রফিক-জব্বারস-সালাম-শফিউররা। 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব

জননিরাপত্তা আইনে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর দুই বছরের বেশি সময় তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। অসুস্থতার কারণে ১৯৫২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমাদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এসময় আলি আহাদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা করেন এবং তাদের দিক নির্দেশনাও দেন। সেসময় তিনি তাদের আরও জানান যে, ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে আমরণ অনশন শুরু করবেন। এই অনশনের কথা জানতে পেরে সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা নিরাপদ মনে না করে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত করে। ফরিদপুর যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে সমবেত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে তিনি এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি বলেন- একুশে ফেব্রুয়ারি এসেম্বলি বসবে, এমএলএ-দের কাছ থেকে রাষ্ট্রভাষার বাংলার পক্ষে দস্তখত আদায় করবে।

শেখ মুজিবের স্টিমার ঘাটে সেদিনের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা ভাষা আন্দোলনে নতুন মাত্র যোগ করে। এরপর ফরিদপুর জেলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি সকল রাজবন্দির মুক্তিসহ ভাষার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। বরিশালের মহিউদ্দিন আহম্মদও মুজিবের সাথে অনশন শুরু করেন। সারা দেশব্যাপী শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন জোরদার হতে থাকলে, সরকার শেষ পর্যন্ত জনদাবির কাছে মাথা নত করে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়। জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে সাথে সাথেই মুজিব ঢাকার আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসে এক তার বার্তায় ২১ ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।