বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের ভূমিকা

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কন্যা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে জনমত সৃষ্টি করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। পাকিস্তানি হানাদাররা যখন এদেশের লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটিকে গৃহযুদ্ধ বলে চালানোর চেষ্টা করছিল, তখন একমাত্র ইন্দিরা গান্ধী এর প্রতিবাদ করেছেন। সাধারণ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রকৃত সত্যটা তিনি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেছেন- বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানিদের শোষণ ও নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছে, জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি, তাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের জেলে আটকে রেখে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, এই যুদ্ধ কোনো গৃহযুদ্ধ নয়, এটা বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, এটা দীর্ঘদিনের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাত কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের যুদ্ধ।

এদিকে যুদ্ধের শুরুর দিকেই পরাশক্তি চীন যখন প্রকাশ্যভাবে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের নামে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলছিল যুক্তরাষ্ট্র; তখন বাংলাদেশের পক্ষে মিত্র জোগাড় করার জন্য সোভিয়েন ইউনিয়নের সঙ্গে এক মৈত্রী চুক্তি সম্পন্ন করে ভারত। এরপর বাংলাদেশের যে কোনো রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন পাশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। বাংলাদেশের পক্ষে পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের এই প্রকাশ্য অবস্থান সম্ভব হয়েছিল শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে। চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে এই সমর্থন আমাদের ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করেছে। এমনকি যুদ্ধের শেষের দিকে পলায়নপর পাকিস্তানি বাহিনীকে সৈন্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য আমেরিকার উদ্যোগেও ব্যর্থ হয়েছে একারণে।

যুদ্ধের শুরু থেকেই এভাবে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে সহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। একেবারে শুরুর দিকে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করার পরেই চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। এরপর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশের আপামর জনতা, তা দেখে বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কিশোর-তরুণরা যেভাবে কয়েকদিনের ট্রেনিং নিয়ে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে একটা প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে নেমেছিল, তা জেনে শিহরিত হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ দুই যুগের বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতনের হাত থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা বাঙালির প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করছিলেন ভারতের এই প্রিয়দর্শিনী প্রধানমন্ত্রী। মৌলিক ও মানবিক জায়গা থেকে নিজেকে তিনি একাত্ম করে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের প্রতিটি যুদ্ধরত মানুষের সঙ্গে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে ব্রিটিশ সংবাদপত্র 'নিউজ উইক'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, 'আমাকে যদি বাঙালির মতো অবস্থায় ফেলে দেয়া হতো, আমি অবশ্যই যুদ্ধ করতাম।'

২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের ঘুমন্ত মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের পর থেকেই পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত। যার ফলে ২৭ মার্চ লোকসভার ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই ব্যাপারে কথা বলেছেন। এরপর ৩১ মার্চ শ্রীমতি গান্ধী কর্তৃক উত্থাপিত এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব লোকসভায় গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতি সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার ঘোষিত হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন দিতে শুরু করে।

এরপর ৩ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে উল্লেখ করে ভারতের কাছে সাহায্যের আবেদন জানালে শ্রীমতি গান্ধী সবধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

এরমধ্যেই বাংলাদেশ প্রশ্নে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করে চীন। এ বিষয়ে ১৩ এপ্রিল লাখনৌতে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, 'পাকিস্তানের প্রতি চীনের প্রকাশ্য সমর্থন ভারতকে তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।' একইদিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি সভায় শ্রীমতি গান্ধী বাংলাদেশে সংগঠিত বিষয়কে পাকিস্তানের নিজস্ব ব্যাপার বলে মনে না করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন।

যুদ্ধের দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সীমান্তগুলোতে বাংলাদেশী শরণার্থীর ঢল নামে। শরণার্থীদের বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানিদের নিপীড়নের ব্যাপারেও তথ্য জানাতে থাকেন তিনি।

১৩ মে বিশ্বশান্তি সংঘের সম্মেলনে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের একজন প্রতিনিধি যোগদান করেন। তিনি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা দেন। এই সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের আন্দোলনে তাদের পূর্ণ সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থন জানানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পাঠানো একটি বার্তা ৮০টি দেশের প্রায় সাতশ' প্রতিনিধির সামনে প্রকাশ্য অধিবেশনে পড়ে শোনানো হয়। বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে কঠোর হুঁশিয়ারী দেওয়া সেই বার্তায় তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের জনসাধারণের ন্যায্য দাবি, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দেশ শাসন করবেন। এবং শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরে যেতে পারে, তেমন অবস্থা সৃষ্টি করার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই বাধ্য করতে হবে।'

এদিকে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি জান্তাদের নির্মমতার ব্যাপারে জানাতে ২৩ মে মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদাত হোসেনের কাছে চিঠি পাঠান শ্রীমতি গান্ধী। পূর্ববাংলার পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সাদাত যেন এ বিষয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং যাতে পূর্ববাংলায় রক্তপাত বন্ধ হয় সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেন।

এমনকি নিজ দেশের জনসাধারণের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাপারে সহযোগিতামূলক মনোভাব গঠনের প্রতিও গুরুত্ব দেন তিনি শ্রীমতি গান্ধী। ২৯ জুন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার নৈরাশ্যজনক তথ্য উপস্থিত করায় শ্রীমতি গান্ধী দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'সদস্যরা তাদের নির্বাচনী কেন্দ্রে ফিরে গিয়ে কেন বাংলাদেশের সমর্থনে জনমত সংগঠিত করছেন না। ত্রাণের কাজে জনসাধারণের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন আছে।'

আমেরিকার এসময় পাকিস্তানের পাশে থাকায় আমেরিকারও সমালোচনা করেন ইন্দিরা গান্ধী। তিনি ৭ জুলাই আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে জানান, পাকিস্তানকে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ এই অঞ্চলে শান্তির প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানের সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুকে প্রহসনের বিচারে হত্যার পরিকল্পনা করা হলে সেটা নিয়েও বিশ্বনেতাদের সজাগ করে তোলেন তিনি। ৮ আগস্ট ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বার্তায় বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা ও মুক্তির দাবি জানিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানানো হয়। এরপর এ বিষয়ে কথা বলা শুরু করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

বিশ্বের অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানার কারণে কোনো অবস্থান না নেওয়ায় দুঃখ প্রকাশ ইন্দিরা গান্ধী। ৩০ আগস্ট বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে গান্ধী বলেন, 'বাংলাদেশে যে যুদ্ধ হচ্ছে, তা হচ্ছে মূলত সেদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে ইসলামাবাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও নিষ্ঠুর সামরিক চক্রের যুদ্ধ। বাংলাদেশের জনগণ তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। তাছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণও এই সামরিক শাসনের বিপক্ষে ক্রমাগতভাবে সোচ্চার হয়ে উঠছে।' শ্রীমতি গান্ধী আরো বলেন, 'ভারতের জনগণ, পার্লামেন্ট ও সরকার বাংলাদেশের আন্দোলনরত জনগণকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাবে। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের কোনো বিরোধ নেই। তবে সেই দেশের সামরিক জান্তা তাদের জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।'

১৯৭১ সালে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে সোভিয়েত সফরে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর ক্রেমলিনে সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ, পোদগর্নি ও কোসিগিনের সঙ্গে 'বাংলাদেশ' প্রশ্নে ছয় ঘণ্টা আলোচনা করেন। সেখানে তিনি বলেন, 'পূর্ববাংলার জনগণ পাকিস্তানি সরকারের সঙ্গে এক মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। এটা ভারত-পাকিস্তান সমস্যা নয়। এটা একটা আন্তর্জাতিক সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার প্রতি আন্তর্জাতিক সাড়া অত্যন্ত তুচ্ছ। শরণার্থীরা যাতে তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে, সে ব্যাপারে সাহায্য করা বিশ্বের সব রাষ্ট্রের একান্ত দায়িত্ব বলে ভারত মনে করে।' এসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে বাংলাদেশের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সব রকমের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি আদায় করেন তিনি।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ করতে ২৪ অক্টোবর বিশ্ব সফরে বের হয়ে ১৪ নভেম্বর দিল্লি ফেরেন শ্রীমতি গান্ধী। এসময় বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, আমেরিকাসহ অনেক দেশে গিয়ে তাদের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন তিনি। তার এই ১৯ দিনের সফর ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এই সফরে তিনি ইউরোপের নেতাদের কাছে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের তথ্য তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশের ব্যাপারে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করেন তাদের কাছ থেকে। কিন্তু সমস্যা হয় আমেরিকার সঙ্গে। ৪ ও ৫ নভেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। নিক্সন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ বলতে চাইলে দ্বিমত পোষণ করেন শ্রীমতি গান্ধী। বৈঠকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন, 'ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান-ভারত সীমান্ত থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অতএব, আপনার উচিত হবে সমগ্র পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী অপসারণ করা।' জবাবে শ্রীমতি গান্ধী অত্যন্ত শান্তভাবে প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে জানিয়েছিলেন, ইয়াহিয়া খানকে তার সমস্ত সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এর আগে কোনো কথা নয়।

দীর্ঘ সরকারি বিদেশ সফর শেষে দিল্লি ফেরার পরদিন ১৫ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিউজ উইক পত্রিকাকে বলেন, 'আমাকে যদি বাঙালির মতো অবস্থায় ফেলে দেওয়া হতো, আমি অবশ্যই যুদ্ধ করতাম। ভারত বিশ্বের সব স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করে।'

এরপরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা, ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত। এসময় বিশ্বের অনেক সংস্থা ও কিছু দেশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানবিকতার কথা বলতে শুরু করে। তারা তখন যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব দেয়। মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে তখন তীব্রভাবে গর্জে ওঠেন ইন্দিরা গান্ধী। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিব উন্টের কাছে একপত্রে বলেন, 'বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য হটিয়ে নিতে হবে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকচক্রের আলোচনায় বসতে হবে। এখন তারা (বাংলাদেশ) স্বাধীন।' শ্রীমতি গান্ধী প্রশ্ন রাখেন, বহুরাষ্ট্র এখন আমাদের শান্তির ললিতবাণী শোনাচ্ছে। গত ৯ মাস ধরে বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা লক্ষ লক্ষ নর-নারী ও শিশু হত্যা করেছে, এককোটি লোককে দেশছাড়া করেছে, শান্তিবাদীরা কী তখন চোখবন্ধ করেছিল! ভারত দীর্ঘদিন সংযত ছিল। এখন ভারতের শর্তে এবং বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতেই শান্তি আসছে।

এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মহান বিজয়। সেদিন বিকালে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিজয়ী জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষকে অভিনন্দন জানান এই দীর্ঘ যুদ্ধযাত্রার একক ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সদ্য স্বাধীন দেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।