অসহযোগ আন্দোলন

১৯৭১ সাল। পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ ঘোষণা করেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ৈ ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো। এরপরপরই ফুঁসে ওঠে আপামর বাঙালি। কর্মসূচি ঘোষণা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২ মার্চ উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। অর্ধদিবস হরতাল ও প্রশাসনিক কাঠামোকে অচল করে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। মার্চের শুরুতেই এই ভূখণ্ড পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চের পড়ন্ত দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় রণকৌশলের সার্বিক নির্দেশনা প্রদান করে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু পাকিস্তানিরা সেই ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করতে বাধা প্রদান করে। ফলে কর্মস্থল ত্যাগ করেন বেতারের কর্মীরা।

৮ মার্চ

পাকিস্তান বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পত্রপত্রিকাগুলোও ফলাও করে এ খবর প্রচার করে। ‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি—’ এটা ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান সংবাদের শিরোনাম। এ ছাড়া প্রথম পৃষ্ঠায় ‘আজ থেকে আমার নির্দেশ—’ নামে আরেকটি খবর ছাপা হয়, যেখানে বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু দিকনির্দেশনা ছিল। আমরা সেখানে পাই—বঙ্গবন্ধু ঢাকায় যারা স্থানীয় নয় এমন লোকদের ঢাকা ছাড়ার জন্য আদেশ দেন। তা ছাড়া সবখানে সেদিন থেকে কালো পতাকা উড্ডয়ন করার নির্দেশও দেন। এই দুটি নির্দেশই পরবর্তী দিনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দৈনিক সংগ্রাম একমাত্র পত্রিকা, যারা ৮ মার্চের পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি অংশ তুলে দিয়ে শিরোনাম দিয়েছিল—‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম : মুজিব’।

তা ছাড়া সেদিন আরেকটি ছোট্ট ব্যাপার সংঘটিত হয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ আরো অনেক ছাত্রনেতা মিলে একটি বিবৃতি দেন। যেখানে তাঁরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এটি ছোট ঘটনা হলেও প্রভাব ছিল ব্যাপক।

৯ মার্চ

বঙ্গবন্ধুর আদেশগুলো কতটা কার্যকর ছিল তার প্রমাণ মেলে পরের দিনের পত্রিকায়। ৯ মার্চের ইত্তেফাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল ‘অস্থানীয়দের ঢাকা ত্যাগের হিড়িক : এসব তবে কিসের আলামত?’ এ ছাড়া এক দিনের মধ্যেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি জরুরি সভায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন। ওই সভায়ই আরেকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেটিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বাংলাদেশে জাতীয় সরকার’ গঠনের জন্য অনুরোধ করা হয়। যদিও বাংলাদেশ পরিচয় হয়নি, তবু ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের একটি সরকারের কল্পনা করা শুরু করে দিয়েছিলেন; যেটি অনেক সংবাদপত্র গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।

সেদিন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ভাষণের দুই দিন পর অর্থাৎ ৯ মার্চ একটি ভাষণ দেন মওলানা ভাসানী। তিনি সেই ভাষণে বলেন, ‘১২ মার্চের মধ্যে যদি স্বাধীনতা দেওয়া না হয় তাহা হইলে আমি ও শেখ মুজিব পুনরায় ১৯৫২ সালের মত একযোগে আন্দোলন করিব—প্রধানমন্ত্রী হইতে আমরা যাইবো না।’ এ খবরও তখনকার পত্রিকায় প্রথম পাতায় বড় পরিসরে ছাপা হয়েছিল।

১০ মার্চ

“ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরী সভায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাকে। এ ছাড়া মওলানা ভাসানীর ভাষণ ও স্বাধীনতায় একাত্মতা প্রকাশের ব্যাপারে ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ দৈনিক সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘মুজিবের সঙ্গে একযোগে আন্দোলন করিব : ভাসানী’। দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অশীতিপর বৃদ্ধ রাজনৈতিক নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল (মঙ্গলবার) পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতাকালে অবিলম্বে বাংলার স্বাধীনতা প্রদানের জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। মওলানা বলেন, ‘১২ মার্চের মধ্যে যদি স্বাধীনতা দেওয়া না হয় তাহা হইলে আমি ও শেখ মুজিব পুনরায় ১৯৫২ সালের মত একযোগে আন্দোলন করিব, প্রধানমন্ত্রী হইতে আমরা যাইবো না।’

১১ মার্চ

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর প্রশাসনিক কাজে যেন বাঙালিরা সহায়তা না করে। ৭ই মার্চের ভাষণে সেটা বলেছিলেন তিনি। তাঁর কথা কার্যকর হয় মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়। ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ সরকারি ও আধা সরকারি প্রায় সব কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। আদালত থেকে শুরু করে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তাই স্বাধীনতার ডাককে সমর্থন করে কর্মস্থল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বের হয়ে আসেন। এটি ছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের প্রথম বর্ষণ মাত্র।

তবে কূট-কৌশলী ভুট্টো এক তারবার্তায় বঙ্গবন্ধুকে জানান, তিনি ঢাকায় এসে কথাবার্তা বলতে রাজি। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান মারাত্মকভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছিল। ১১ মার্চ থেকে দেখা যায় পাকিস্তানের বড় পত্রিকাগুলো কাগজের সংকটে পড়েছে। সংকট এত তীব্র ছিল যে ডনের মতো বড় পত্রিকাও ১৪ পৃষ্ঠা থেকে ১০ পৃষ্ঠা ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ তাদের নিউজপ্রিন্টের কাগজ যেত খুলনা নিউজপ্রিন্ট থেকে। পশ্চিম পাকিস্তানে কাগজের চালান বন্ধ করে দেয় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল। এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে জানিয়ে সেদিনই ইয়াহিয়া খান ব্যবসায়ীদের একটি বার্তা দেন।

১২ মার্চ

লাহোরে সেদিন একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। সেখানে এয়ার মার্শাল আজগর আলি খান বলেন, লাহোরের জন্যই ঢাকার এই অবস্থা। শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে অবস্থা আরো অবনতির দিকে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে ধীরে ধীরে পাকিস্তানের প্রতি ক্ষোভ ফুঁসে উঠছিল। পাকিস্তান সরকার থেকে পাওয়া পদবি ফিরিয়ে দেন জাতীয় পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ জহির উদ্দীন। ১৫ সদস্যের একটি দল বগুড়ার জেল থেকে পালিয়ে বের হয়। লন্ডনের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ ছাপা হয়, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের শক্তি প্রয়োগ করা হবে ভুল সিদ্ধান্ত ও অকার্যকর। এদিকে জাতীয় পরিষদ বেশ পাকাপোক্ত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। সুফিয়া কামালকে সভাপতি মেনে সারা আলীর তোপখানা রোডের বাসায় মহিলা পরিষদের একটি সভা হয়। পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

১৩ মার্চ

ইত্তেফাকে প্রাধান্য পায় মহিলা পরিষদের খবর। সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংসদ গঠনের আহ্বান’। অন্যদিকে প্রশাসন প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল। সামরিক কর্তৃপক্ষ সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বলা হয়, ১৫ তারিখের মধ্যে যোগ না দিলে বেতন বাতিল ও বহিষ্কার করা হবে। মার্শাল ল ও ১১৫ ধারা জারি হয়। এ ঘটনাকে বঙ্গবন্ধু এক ধরনের উসকানি বলেও মন্তব্য করেন। সেদিন শিল্পী জয়নুল আবেদিন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পাওয়া পদবি ও বিশেষ পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। অন্যদিকে পাকিস্তানিরা বড় হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছিল চুপিসারে। তারই ধারাবাহিকতায় বিদেশি কূটনীতিকদের অপসারণ করা হচ্ছিল ধীরে-সুস্থে। মার্চের ১৩ তারিখেই অপসারণ করা হয় পশ্চিম জার্মানির ৬০ জন, জাতিসংঘের ৪৫ জন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্সের ৪০ জনসহ মোট ২৬৫ জন বিদেশিকে।

১৪ মার্চ

রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। সংগ্রাম দানা বাঁধতে শুরু করেছে বিভিন্ন জায়গায়। বঙ্গবন্ধু এই দিনে দ্বিতীয়বারের মতো আবারও অসহযোগ আন্দোলনের জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। তিনি সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমরা আন্দোলন থামাবো কেন? আমরা তো আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছি।’

পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো দুই দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এক নতুন ফর্মুলার কথা বলেন। সেখানে তিনি জানান পাকিস্তানের দুই বড় দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখাও করতে চান। দিন দিন লাহোরের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তান যেমন কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোনো চালানই গ্রহণ করা হচ্ছিল না। ১৪ তারিখ হঠাৎ খবর আসে ঢাকায় পাঠাতে না পারায় লাহোরে মণের পর মণ ফল নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে পানের চালান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় করাচিতে পানের দাম বেড়ে দেড় শ রুপি হয়ে যায়।

১৫ মার্চ

‘বাঁচাও! বাঁচাও! বাংলার অসহযোগে পশ্চিমা শিল্পপতিদের নাভিশ্বাস’। ১৫ মার্চের দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম। এই সংবাদে করাচি, লাহোরসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্যাবসায়িক ভঙ্গুর অবস্থার কথা বলা হয়। লেখা হয়, ‘করাচীতে বর্তমান প্রতি সের পান ১৫০ টাকায় বিক্রয় হইতেছে। ঢাকা হইতে পান না যাইতে পারায় করাচীতে পান বিরল হইয়ে পড়িয়াছে।’ সেদিন গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা ঘটে। একটি হলো করাচিতে ভুট্টো সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শেখ মুজিবকে নিয়ে সরকার গঠন করা উচিত। আর দ্বিতীয় হলো প্রায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঢাকায় আসেন ইয়াহিয়া খান। বিমানবন্দরে সাংবাদিক ছিল নিষিদ্ধ। মূলত দুটি ব্যাপারই ছিল এক প্রকার ফাঁদ। কিন্তু এই ফাঁদের যোগ্য জবাব দেন শেখ মুজিব সেদিনই। তিনি বলেন, ‘কে আসল বা কে কী বলল, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেই যাব।’ তিনি সেদিন আরো বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেন। যেগুলো পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক কৌশলকে আরো দুর্বল করে দিয়েছিল। এ দিন বেতারের সব কর্মকাণ্ড বাংলায় প্রচলন করার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৬ মার্চ

১৬ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে আটটি পয়েন্টে আগের দিন (১৫ মার্চ ১৯৭১) দেওয়া দিকনির্দেশনা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয়—‘সর্বসাধারণের প্রতি আমার নির্দেশ’। এ ছাড়া সেই প্রতিবেদনের নিচেই আরেকটি খবর প্রকাশিত হয় এই শিরোনামে—‘চট্টগ্রামে বেতার কেন্দ্রে সকল কাজে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্ত’। সেদিন দুপুরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আসেন দেখা করতে। রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

১৭ মার্চ

দেশের সংকটময় অবস্থায়ও শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে বিভিন্ন সংস্থা ও শিল্পীরা শুভেচ্ছা জানাতে আসে। এর মাঝেই ইয়াহিয়া খান বৈঠকে বসতে চান। বঙ্গবন্ধু নিজের জন্মদিনে দ্বিতীয় বৈঠকে বসেন। সেদিনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে আলোচনা চলছিল বেশ। সেদিন নিউজউইকের একটি নিজস্ব পর্যালোচনাও প্রকাশ করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্তমান সিদ্ধান্ত যে অকার্যকর ও ভুল, সেটি উল্লেখ করা হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক বিখ্যাত কূটনীতিকদের বিভিন্ন মতামত সামনে রেখে প্রতিবেদক লোরেন জেনকিনসন লেখেন ‘পূর্ব এবং পশ্চিমাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হবে এটা কোনো প্রশ্ন নয়। বরং পরিস্থিতি হঠাৎ এতদূর গড়িয়েছে যে, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল কি পরবর্তী সপ্তাহে কিংবা আগামী মাসে অথবা দুই বছর পর বিচ্ছিন্ন হবে এটাই প্রশ্ন।’ সেদিন ভারত প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের আকাশসীমায় বাংলাদেশগামী উড়োজাহাজ নিষিদ্ধ করে দেশটি।

১৮ মার্চ

‘ভারতের উপর দিয়া বাংলাদেশগামী সকল বিদেশী বিমান চলাচল নিষিদ্ধ’। এটি ছিল ১৮ মার্চ ১৯৭১ সালের দৈনিক সংবাদের একটি প্রতিবেদন। সেখানে লেখা হয়, ‘ধারণা করা হইতেছে যে, বিদেশি বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে গোলযোগপূর্ণ পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য বহন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ভারত সরকার অনুরূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছেন।’

১৯ মার্চ

এই দিন ইত্তেফাকের খবর—‘আমি শেখ মুজিব বলছি : এ তদন্ত কমিশন চাহি নাই’। তার পরও সেদিন তৃতীয় দফায় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলে। সেদিন প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ জনগণের একটি সংঘর্ষ হয় ঢাকার বাইরে জয়দেবপুরে। মূলত সামরিক বাহিনীর অতর্কিত হামলার কারণেই সংঘর্ষের সৃষ্টি। এলাকায় জারি হয় কারফিউ।

২০ মার্চ

চতুর্থবারের মতো বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠক হয়। ৯০ মিনিটের সেই বৈঠকে শুধুই সময় নষ্ট করেন ইয়াহিয়া। সেদিনের ইত্তেফাকে ছাপা হয়, ভারতের নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড ও তাঁকে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

২১ মার্চ

ভোর ৬টা। বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ প্রথম পতাকা উত্তোলন করে। সকাল ৯টায় তারা পল্টনে জয়বাংলা কুচকাওয়াজ করে। দুপুর ১টায় বায়তুল মোকাররমে ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেদিন ভুট্টো গোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ঢাকার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। প্রত্যেক বাসার ছাদে উড়ছিল বিভিন্ন আকৃতির পতাকা। যার মধ্যে ফুটে আছে বাংলাদেশের মানচিত্র। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফের বৈঠক করেন ইয়াহিয়া।

২২ মার্চ

বঙ্গবন্ধু তার দাবিতে অনড়। ভুট্টোর উপস্থিতিতে ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক চলে। মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মায় এবার হয়তো এসব শেষ হতে চলেছে। হয়তো নাটকীয় সিদ্ধান্ত আসবে। নয়তো সামরিক শাসনের অবসান ঘটবে। পরের দিনের পত্রিকাগুলোতেও এর ছাপ লক্ষ করা যায়। সেদিন ছাত্রসংগ্রাম সংসদ একটি যুগোপযোগী কাজ করে। তারা একটি পরিকল্পিত পতাকার মাপ ও বিবরণ প্রকাশ করে, যা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে পাকিস্তানি কৌশলের কফিনে শেষ পেরেক ছিল।

২৩ মার্চ

সব বড় অফিস বন্ধ। ২৩ তারিখ পাকিস্তান দিবস থাকলেও শুধু প্রেসিডেন্টের বাসভবনে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত ছিল। আর কোথাও দেখা যায়নি। পাকিস্তান দিবসে বরং উড়ছিল বাংলাদেশের নতুন পতাকা।

২৪ মার্চ

ছোট ছোট পাকিস্তানি দল ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করে। ইয়াহিয়া-মুজিবের দফায় দফায় বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও ‘কোনো প্রকার নতি স্বীকার করা হবে না’ বলে সাফ জানিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বক্তব্য শেষ। আর অপেক্ষা নয়। দিনের পর দিন অপেক্ষা চলে না।’ সেদিন ঢাকার মিরপুরে একটি বাড়ি থেকে বাংলাদেশি পতাকা নামাতে বাধ্য করা হয়। আরেক জায়গায় একজন শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করা হয়। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করলেও পাকিস্তান আর্মি তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়।

২৫ মার্চ ১৯৭১

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীনের উক্তি দিয়ে দৈনিক সংবাদের প্রধান শিরোনাম ছিল—‘অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা চলে না’। তারপর আসে সেই কালরাত। বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। মানসিক ভারসাম্যহীনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত অসহায় খেটে খাওয়া বাঙালিদের ওপর। ঢাকায় বয়ে যায় রক্তের বন্যা। গ্রেফতারের আগে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।