সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী, এখনো আক্রমণ থামেনি

২৫ জানুয়ারি, ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, কিন্তু দিনটি কেনো অর্থবহ তা আজ অনেকেই স্মরণ করতে পারে না এবং যাদের স্মৃতিতে আছে তারাও ইচ্ছাকৃতভাবে স্মরণ করার চেষ্টা করে না। ব্যাপারটা এমন, যেনো বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে দিনটি বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে। আসুন ইতিহাসের দিকে তাকাই, পেছনের দিনগুলিতে ফিরুন, স্মৃতিতে একটা ঝাঁকুনি দিন। ২৫ জানুয়ারি দিনটি কেনো আমাদের ইতিহাসের অংশ সেই সত্য ঘাঁটলে আপনি হয়তো ধাক্কা খেতে পারেন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে দেশের সংবিধানে একটি উল্লেখযোগ্য সংশোধনী আনা হয়। জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত সংবিধানের এই চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছিল। আইনসভার অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে এই দেশ নতুন ধারার রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এই দিনটিতে।

মূলত জাতিকে একটি নব-উচ্চতার গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার পথে অভিযাত্রা শুরুর জন্যই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। অথচ ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির পর থেকে বছরের পর বছর ধরে যতোই সময় গড়িয়েছে, সাংবিধানিক এই পরিবর্তনকে নিয়ে নাটকীয়ভাবে সমালোচনা করে যাওয়া হয়েছে। সমালোচনার জন্য যে বিষয়গুলোকে প্রধানত সামনে আনা হয়েছে সেগুলো হলো- চতুর্থ সংশোধনীর পর বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন, যাকে বলা হয়েছে এক দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রচলন এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় ফেরা, যাকে অগতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলা অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু আসলেই কী তাই? বাস্তবতা হলো, মূলধারার সব দল নিয়েই বাকশাল গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি সর্বদলীয় জাতীয় সরকার।

বঙ্গবন্ধু অনেক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ছিলেন। তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের শুরুতেই একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, যাকে তিনি অভিহিত করেছিলেন 'দ্বিতীয় বিপ্লব' হিসেবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আওয়ামী লীগসহ সাংবিধানিকভাবে সংগঠিত এবং মূলধারার সব রাজনৈতিক দলকে তিনি একত্রে একটি পাটাতনে এনেছিলেন, স্পষ্টতই এটি ছিল একটি জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। এই ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব মতামত হলো- কট্টর বাম ও ডান-পন্থীদের উগ্র তৎপরতায় দেশে সৃষ্ট নৈরাজ্য প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রের মূল অংশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির বিস্তার রোধে এই পরিবর্তন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল।

আমাদের জাতীয় ইতিহাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনার একটি বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে বাকশালের গল্প। তাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর এই বছরে বাকশাল এবং চতুর্থ সংশোধনীর পুনর্পাঠ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্তের কারণগুলো বোঝার জন্য রাজনৈতিক এবং অ্যাকাডেমিকভাবে ওই সময়টাকে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ এবং দর্শন নিয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্রেও রহস্যজনকভাবে কখনোই বাকশালকে নিয়ে কোনো গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই বাকশাল নিয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। আওয়ামী লীগের খুঁত-সন্ধানীরা সবসময় বাকশালের সঙ্গে গণতন্ত্রের সংঘর্ষ খুঁজে পেয়েছেন, তারা বাকশালকে রীতিমতো গণতন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এটি ইচ্ছাকৃত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বাকশাল নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন। শক্তিশালী রাষ্টপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা কায়েম ছাড়াও আরও বহুমুখী কারণে এই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। মূলত বাকশালের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে অনেকে বাকশাল প্রতিষ্ঠাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তবে বাকশাল ব্যবস্থা চালুর জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি। যারা ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকের এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে পরবর্তীতে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার সম্পর্ক খুঁজতে যান, তারা ভুলের স্বর্গে বাস করছেন। মৌলিক সত্যটা হলো- বঙ্গবন্ধুকে খাটো করা এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি বর্বরোচিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৫ আগস্ট কালরাতে তাকে যে হত্যা করা হলো; ১৯৭৪ সাল থেকেই এই অপচেষ্টার পরিকল্পনা করা হচ্ছিলো। বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাতের জন্য ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল হক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে চিঠি লিখে অর্থনৈতিক সহায়তা চেয়েছিল। খন্দকার মোশতাক ও তার সহযোগীরাও তখন সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল। বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদ করার জন্য ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে এবং ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সুতরাং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ট্রাজেডির পেছনে বাকশাল আসলে কোনো কারণ ছিল না।

এই বাকশাল ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। দেশকে পুনর্গঠনের জন্য ৬১ জেলায় ভাগ করা হয়েছিল। প্রত্যেকটি জেলার প্রধান ছিলেন একজন করে গভর্নর। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুলাই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬১ জন গভর্নরের মধ্যে ৩৩ জন ছিলেন সংসদ সদস্য, ১৩ জন ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং বাকি ১৪ জন বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।

বাকশাল গঠনের পর যেভাবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কথা ভাবা হয়েছিল, সেভাবে অর্থনৈতিক নীতি-প্রণয়নের বিষয়টিও যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যবর্তী সময়টার অর্থনৈতিক প্রবণতা কেমন ছিল তা বুঝতে সেই সম্পর্কিত পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিঃসংকোচে বাকশাল নিয়ে মুক্তকণ্ঠে গবেষণা ও আলোচনা করার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। কারণ ইতিহাস বোঝার জন্য গুজব নয় গবেষণালব্ধ বিষয়গুলোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই গভীরভাবে তথ্যবহুল আলোচনা হোক, অযৌক্তিক ও অন্ধ নেতিবাচকতা থেকে বের হয়ে আসুক নতুন প্রজন্ম।