বিয়ে ও সংসার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও পারিবারিক জীবন একে অন্যের পরিপূরক। একজন দেশপ্রেমী জননেতা হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন পারিবারিক ইতিহাস-ঐতিহ্য, উৎসাহ-অনুপ্রেরণার কারণেই। টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ মুজিবুর রহমান একদিন 'বঙ্গবন্ধু' ও 'জাতির জনক' হয়ে উঠলেন-এর নেপথ্যে তার পরিবারের ভূমিকা অনবদ্য। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ ও কঠিন সময় কেটেছে তার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনার আদর্শিক সঙ্গী ছিলেন তারা।

কৈশোরেই পারিবারিক কারণে বঙ্গবন্ধুকে বিয়ে করতে হয়। বঙ্গবন্ধু তার বিয়ে সম্পর্কে বলেছেন, ''একটা ঘটনা লেখা দরকার, নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স ১২-১৩ বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাওয়ার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, 'তােমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বােনকে লিখে দিয়ে যাবাে।' রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হলো। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বােধ হয় ৩ বছর হবে। রেণুর যখন ৫ বছর বয়স তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর ৭ বছর বয়সে মারা যান। তারপর সে আমার মার কাছে চলে আসে। আমার ভাইবােনদের সাথেই রেণু বড় হয়। রেণুর বড় বােনেরও আমার আরেক চাচাতাে ভাইয়ের সাথে বিবাহ হয়। এরা আমার শ্বশুর বাড়িতে থাকল, কারণ আমার ও রেণুর বাড়ির দরকার নাই। রেণুদের ঘর আমাদের ঘর পাশাপাশি ছিল, মধ্যে মাত্র দুহাত ব্যবধান।"

বঙ্গবন্ধু যে রেণুর কথা বলেছেন, তিনি তার সহধর্মিণী মহীয়সী নারী। ফজিলাতুন নেছার ডাকনাম ছিল রেণু। তিনি মনে-প্রাণে একজন বাঙালি গৃহবধূ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ১৪ বছরের কারাজীবনের সময় শেখ ফজিলাতুন নেছা সংসার জীবনের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তা, অসীম ধৈর্য ও সাহসের সাথে মােকাবিলা করেছেন। দৃঢ়তা ও অসীম মনােবল নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পরিবারের সবার প্রতি তিনি রেখেছিলেন সমদৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু বারবার কারারুদ্ধ হলে শেখ ফজিলাতুন নেছাকে গৃহসামগ্রী বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়েছে। তিনি অনেক অলংকারও বিক্রি করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা নেপথ্যে সর্বান্তকরণে সহযােগিতা করেছেন।

বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে, তখনও বােরখা পরিহিত অবস্থায় বাঙালির মুক্তির সনদ 'ছয় দফা'র কর্মসূচি-ভিত্তিক লিফলেট বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করেছেন। কখনাে দেখা গেছে- তিনি যেখানে লিফলেটগুলাে রেখে আসতেন, সেখান থেকে ছাত্রলীগ কর্মীরা তা সংগ্রহ করে বিলি করতাে।

মা সম্পর্কে বড় মেয়ে শেখ হাসিনা 'শেখ মুজিব আমার পিতা' গ্রন্থে স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমার মা অত্যন্ত পরিপাটি গােছানাে স্বভাবের ছিলেন। প্রতিটি জিনিস অত্যন্ত সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখতেন, যাতে প্রয়ােজনে সবকিছু হাতের কাছে পাওয়া যায়। শীতের কাপড় এক আলমারিতে গােছানাে, গরমের কাপড় অন্য আলমারিতে। তেমনি আটপৌরে কাপড়, স্যাণ্ডেল, জুতা পর্যন্ত সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন। মা যখন আলমারি খুলতেন, দারুণ কৌতূহল হতো- সব কিছু দেখার। অনেক সময় আমিও আলমারি খুলতাম, তবে মা যা বের করতে বলতেন; তাছাড়া অন্য কিছুতে হাত দিতাম না। তবে মা খুললেই হাত দিতে খুব ইচ্ছে হতো, কিন্তু সব আবার গুছিয়ে রাখতে পারব না বলে হাত দেওয়া হতো না।

১৯৬৬ সালের ২৪ জুলাই কারাবাসকালে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, 'আব্বার চিঠি পেলাম আজ সকালে। আমি যখন চিঠি পড়ি, একজন কয়েদি জিজ্ঞাসা করলো- 'চিঠি কী আপনার বাবা লিখেছেন? বললাম, 'হ্যা, তুমি বুঝলে কেমন করে? বলল, দেখলাম লিখেছেন, 'বাবা খােকা। বাবা ছাড়া একথা আর কে আপনাকে লেখতে পারে!' আমি হােসে উঠলাম এবং বললাম, বাবা-মায়ের কাছে আজও আমি খােকাই আছি। যতদিন তারা বেঁচে থাকবেন ততদিনই আমাকে এই বলেই ডাকবেন। যেদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন আর কেহই এ স্নেহের ডাকে আমাকে ডাকবে না। কারণ এ অধিকারই-বা কয়জনের আছে! আমার ৪৫ বৎসর বয়স, চুলেও পাক ধরেছে। পাঁচটি ছেলেমেয়ের বাবা আমি, তথাপি আজও আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে বােধহয় সেই খােকাটি, এখনও মায়ের ও আব্বার গলা ধরে আদর করি, আমার সাথে যখন দেখা হয়।'

১৯৬৭ সালে কারাগারে থাকাকালে 'কারাগারের রােজনামচা' গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, 'কয়েকদিন পূর্বে খবর পেয়েছিলাম আব্বা খুবই অসুস্থ। আমার ভাই তাকে খুলনায় নিয়ে এসেছে চিকিৎসা করাতে। একটু আরােগ্যের দিকে চলেছে। আমার ভাই সরকারকে টেলিগ্রাম করেছে আমাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারােলে ছেড়ে দিতে, কারণ আব্বা আমাকে দেখতে চান। ৮০ বৎসরের উপরে বয়স। আমাকে অত্যন্ত ভালােবাসেন। আমি জানি না আমার মতো এত স্নেহ অন্য কোনাে ছেলে পেয়েছে কিনা! আমার কথা বলতে আমার আব্বা অন্ধ। আমরা ছয় ভাইবােন। সকলে একদিকে, আমি একদিকে। খােদা আমাকে যথেষ্ট সহাশক্তি দিয়েছে, কিন্তু আমার আব্বা-মার অসুস্থতার কথা শুনতে আমি পাগল হয়ে যাই, কিছুই ভালাে লাগে না। খেতেও পারি না, ঘুমাতেও পারি না, তারপর আবার কারাগারে বন্দি। আমি কারাগারে বন্দি অবস্থায় যদি আমার বাবা ও মায়ের কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সহ্য করতে পারবাে কিনা জানি না। এখন আমার ৪৭ বৎসর বয়স, আজও আব্বা ও মায়ের গলা ধরে আমি আদর করি, আর আমাকেও তারা আদর করেন।'

১৯৬৭ সালের ১৪ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু কারাবাসকালে স্ত্রী ফজিলাতুন নেছার সাথে সাক্ষাৎকালে অনুভূতি প্রকাশকালে বলেছেন, ''এক ঘন্টা সময়। সংসারের কথা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, আব্বা-মার শরীরের অবস্থা আলােচনা করতে করতে চলে যায়। কোম্পানি আজও আমার প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা দেয় নাই, তাই একটু অসুবিধা হতে চলেছে বলে রেণু বলল। ডিসেম্বর মাসে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি- চার মাস হয়ে গেল আজও টাকা দিলো না! আমি বললাম, জেল থেকে টেলিগ্রাম করব। প্রথম যদি না দেয়, তবে অন্য পন্থা অবলম্বন করব। আমার টাকা তাদের দিতেই হবে। কোনােমতে চালাইয়া নিয়া যাও। বাড়ির থেকে চাউল আসবে, নিজের বাড়ি, ব্যাঙ্কেও কিছু টাকা আছে। বছর খানেক ভালই চলবে, তারপর দেখা যাবে। আমার যথেষ্ট বন্ধু আছে যারা কিছু টাকা ধার দিতে কৃপণতা করবে না।' রেণু বলল, 'চিন্তা তােমার করতে হবে না।' সত্যই আমি কোনােদিন চিন্তা বাইরেও করতাম না, সংসারের ধার আমি খুবই কমই ধারি।''

বঙ্গবন্ধু কারাগারেই কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়। তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার আসামিও ছিলেন। ফাঁসির দড়ি ঝুলছিল তার মাথার উপর। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারেও ছিলেন। এতসব ঘটনার মুহূর্তগুলাে শেখ ফজিলাতুন নেছা সংসার জীবনে কীভাবে কাটিয়েছেন তা বিস্ময়কর। একদিকে সংসার-সন্তানদের সামলেছেন, অপরদিকে স্বামীর সাথে কারাগারে দেখা করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলেছেন, উকিলের সাথে কথা বলে তার মামলা পরিচালনা করেছেন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ রাজনৈতিক কর্মীদের জানিয়েছেন, দলীয় রাজবন্দি নেতা-কর্মীর স্ত্রীদের খোঁজখবর নিয়েছেন। ছােটবেলায় পিতার মৃত্যুর পর যে কৃষিজমি পেয়েছিলেন তা শ্বশুর শেখ লুৎফর রহমান দেখাশােনা করতেন। জমির ধান-চালের হিসাব শ্বশুর তার হাতে দিতেন। সে টাকায় সংসার চলছে, মামলার খরচ হয়েছে, ধানমন্ডির বাড়ি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে। অকারণে স্বামীর কাছে টাকা চেয়ে তিনি কখনও তাকে বিরক্ত করেন নি। বঙ্গবন্ধু বরং কারাগার থেকে চিঠিতে জানাতেন- টাকা-পয়সা লাগলে আব্বাকে বলিও।

বঙ্গবন্ধু কারাগার জীবন থেকে ফিরে এলে পরম শান্তিতে কটা দিন কাটাতে চেষ্টা করতেন। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আনন্দ করা, কারাগারের গল্প বলা, আপন ভাইবােন, আত্মীয়-স্বজন এলে তাদের সাথে একত্রে বসে চা খাওয়া-দাওয়া, গল্প-সল্প এসবই চলতাে। স্বামীর প্রিয় খাবার তৈরি, তার বিশ্রামের জন্য ব্যবস্থা রাখা, এসব কিছুর প্রতি শেখ ফজিলাতুন নেছার সযত্ন দৃষ্টি ছিল।

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন তার সংসার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছিল—এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ''একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু খেলা ফেলে মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে আর 'আব্বা বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাসিনাকে বলেছে-হাচু আপা, হাচু আপা, তােমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।"

কারাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলােকে বঙ্গবন্ধু তার সংসার জীবনের রক্তের বন্ধন সম্পর্কে বলেছেন, “৮ই ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, 'আব্বা বালি চলাে। কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভােলাতে চেষ্টা করলাম ওতাে বুঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, তােমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসাে।' ওকি বুঝতে চায়। কি করে নিয়ে যাবে এই ছােট্ট ছেলেটাকে, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে। দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তাে মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখন বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।"

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা 'স্মৃতি বড় মধুর, স্মৃতি বড় বেদনা' নিবন্ধে লিখেছেন, 'আন্দোলনের সময় বা আব্বা বন্দি থাকা অবস্থায় পার্টির কাজকর্মে বা আন্দোলনে খরচের টাকাও মা জোগাতেন। অনেক সময় বাজার-হাট বন্ধ করে অথবা নিজের গায়ের গহনা বিক্রি করেও মাকে দেখেছি সংগঠনের জন্য অর্থের জোগান দিতে।'

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার পর তৎকালীন পাকিস্তানি গােয়েন্দা সংস্থা শেখ ফজিলাতুন নেছাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেফতারের হুমকি দেয়। তিনি সে হুমকিতেও এতটুকু বিচলিত হননি। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনে প্রতিটি পদক্ষেপে সক্রিয় সহযােগিতা করেছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত তারই সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা।

বঙ্গবন্ধুর কারাবাসকালে পারিবারিক হাল শক্ত হাতে ধরে রাখতেন ফজিলাতুন নেছা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং উত্তরকালেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একজন রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান ও জাতির পিতার জীবনসঙ্গী হওয়ার কারণে তাকেও ঘাতকরা হত্যা করেছিল।