বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনের অভিজ্ঞতা

জীবনের প্রায় চার ভাগের একভাগ সময়ই জেলে কেটেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। কারাগারে বসেই বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছেন। কারাগারের জীবনই হয়ে পড়েছিল তার বিকল্প ঘরসংসার। জীবনের অনেক সময় জেলে থাকার কারণে, স্ত্রী-সন্তানদের সান্নিধ্য থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। দেখেছেন জীবনের অনেক অদেখা রূপ। জেলে বসে সময় কাটানোর জন্য এসব স্মৃতি নোট করে রাখতেন, এসব লেখনি থেকেই পরবর্তীতে প্রকাশ করা হয় 'কারাগারের রোজনামচা' নামের একটি বই। এখানেই উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন, যন্ত্রণা, কারাগারের ভেতরের অন্যান্য কয়েদিদের প্রসঙ্গ, কারাগারের সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন রকম অপরাধীদের জীবনকথা। তার এসব লেখা থেকেই উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতা।

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা, গণমাধ্যমের অবস্থা, শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন সম্পর্কেও লিখেছেন তিনি। স্মৃতির খাতায় বঙ্গবন্ধু বারবার উল্লেখ করেছেন জেলজীবনের কষ্টের কথা। পরিবার ও দেশের মানুষের কাছ থেকে দূরে থেকে, আন্দোলন সংগ্রামে সহযোদ্ধাদের পাশে না থাকার মনোবেদনা তিনি বর্ণনা করেছেন। এসব লেখায় আরো উঠে এসেছে- সন্তানদের কাছে না পাওয়ার কথা, বাবা-মায়ের অসুস্থ থাকার কথা শুনেও দেখতে না যেতে পারা কষ্টের কথা। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, 'রাজবন্দি হিসেবে জেল খেটেছি, সশ্রম কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছে। আবার হাজতি হিসেবেও জেল খাটতে হয়েছে। তাই সকল রকম কয়েদির অবস্থা নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছি।'

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে বারবার বন্দি করেও তার মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- 'আমার মনে হয় মোনায়েম খান সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে কোনো কোনো বন্ধুর কাছ থেকে বুদ্ধি নিয়েছেন। তিনি ভুলে গেছেন এটা পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাকিস্তান নহে! আন্দোলন করা এবং নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা এরা রাখে।' ১২ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- 'ভরসা আমার আছে, জনগণের সমর্থন এবং ভালবাসা দুইই আছে আমাদের জন্য। তাই আন্দোলন ও পার্টির কাজ চলবে।'

জন্মের পর থেকেই শিশু রাসেল দেখে আসছে যে- তার বাবা বাসায় থাকেন না; থাকেন কারাগারে। অবুঝ শিশুমনে তাই ধারণা হয়েছিল- কারাগারটাই বুঝি তার 'আব্বার বাড়ি'। ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন রাসেল গিয়েছিল বাবাকে দেখতে। বঙ্গবন্ধু নেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ''১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না, যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই 'আব্বা আব্বা' বলে চিৎকার করছে। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিলো। ওরা বলল, আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ওর ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি।'' বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন, ''৮ ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বালি চলো’। কী উত্তর ওকে আমি দেবো। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, 'তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।' ও কী বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! জেল কোডে আছে, কোনো কয়েদিকে তিন মাসের বেশি একাকী রাখা চলবে না।''

একাকী রাখার কারণে বঙ্গবন্ধু অনশনও করেছিলেন। শাস্তি দেওয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক বন্দিদের একাকী রাখত। কারাগারে একাকী থাকা যে কত কষ্টকর, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুভব করতে পারবে না। কারাগারে অন্য বন্দিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দেখা করা বা কথা বলার সুযোগ পেতেন না। বঙ্গবন্ধুর বর্ণনায় তা উঠে এসেছে এভাবে- 'কারও সঙ্গে আলাপ করার উপায় নাই। কারও সঙ্গে পরামর্শ করারও উপায় নাই। সান্ত্বনা দেবার কেহ নাই। কারাগারের ভিতর একাকী রাখার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে?'

আরেক জায়গায় লিখেছেন, 'জেলে রাতটাই বেশি কষ্টের। আবার যারা আমার মতো একাকী নির্জন স্থানে থাকতে বাধ্য হয়, যাকে ইংরেজিতে বলে সলিটারি কনফাইয়েনমেন্ট, তাদের অবস্থা কল্পনা করা যায় না।'

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে থাকতে না দেওয়ায় ঈদের দিনও তাকে একা থাকতে হতো।

কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, 'একাকী কি ঈদ উদযাপন করা যায়?' তারপরও যতটা সম্ভব ঈদের দিন বঙ্গবন্ধু অন্য বন্দিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। বঙ্গবন্ধুর জবানিতে তারই একটি চিত্র হচ্ছে এরকম- 'নামাজ পড়ার পর শত শত কয়েদি আমাকে ঘিরে ফেলল। সকলের সাথে হাত মিলাতে আমার প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল।' বঙ্গবন্ধু জানতেন, জীবনের আরও অনেক ঈদ হয়তো জেলে কাটাতে হবে। এ ব্যাপারে তার লেখা থেকে পাওয়া যায়, 'আগামী ১৩ জানুয়ারি ঈদের নামাজ। ছেলেমেয়েরা জামা-কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না, কারণ আমি জেলে।' অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেছেন- 'আজ কোরবানির ঈদ। গত ঈদেও জেলে ছিলাম। এবারও জেলে। বন্দি জীবনে ঈদ উদযাপন করা একটি মর্মান্তিক ঘটনা বলা চলে।'

ঈদের দিন পাকিস্তানের জেলে কাটানোর স্মৃতিচারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর এভাবে, 'আমার প্রিয় জনগণ কীভাবে তাদের ঈদ উৎসব পালন করছে? এই প্রশ্ন আমি করলাম, জানি না কাকে! সেই দিন, আবার কখনো তাদের দেখা পাবো কিনা সেটা না জেনেই, আমি মোনাজাত করে আমার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তা দয়াময় আল্লাহতা’লার হাতে সমর্পণ করলাম। এটাই ছিল আমার ঈদ।'

জেলজীবনে মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন বঙ্গবন্ধু। তারই একটি খণ্ডচিত্র আমরা পাই ২৯ জুলাই ১৯৬৬ তারিখের ‘কারাগারের রোজনামচা’য়। এদিন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, 'সারাদিন ব্যথায় কাতর। ডাক্তার ক্যাপ্টেন সামাদ সাহেব এলেন আমাকে দেখতে। খাবার ঔষধ দিলেন, আরও দিলেন মালিশ। বিছানায় পড়ে রইলাম। সন্ধ্যার দিকে কষ্ট করে বের হয়ে বাগানের ভেতর আরাম কেদারায় কিছু সময় বসে আবার শুয়ে পড়লাম। খুবই কষ্ট পেতেছি।'

এর আগে ১৯৫০ সালে গোপালগঞ্জ জেলে থাকাকালে অসুস্থ হয়ে পড়ের বঙ্গবন্ধু। খুলনা জেলে ভীষণ জ্বর ও মাথাব্যথা এবং বুকে ব্যথা ধরা পড়ে; চোখের অসুখও বাড়ে। ভালো চিকিৎসার দাবিতে ফরিদপুর জেলে বঙ্গবন্ধু অনশন করেন। জেল চিকিৎসকরা জোর করে টিউব ঢুকিয়ে তরল খাবার প্রবেশ করালে নাকে ক্ষত সৃষ্টি হয়, আর এতে হার্টের অবস্থা খারাপ হয়, পালপিটিশন বাড়ে এবং নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। ১৯৬৬ সালে জেলে থাকাকালে অনিদ্রা ও ক্ষুধামন্দায় ভোগেন তিনি।

একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও নির্জন কারাবাসেও বঙ্গবন্ধুর মনোবল নষ্ট হয়নি; অটল ছিল মনের দৃঢ়তা। ১৯৬৬ সালের ২৯ জুন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখেছেন, 'খুব সাবধানে থাকি আমি জেলে। শরীর রক্ষা করতে চাই, বাঁচতে চাই, কাজ আছে অনেক আমার। তবে একটা ছেড়ে আরেকটা ব্যারাম এসে দেখা দেয়।'

এমনই দুঃখে ভরা ছিলো বাঙালির রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবন। কারাগারে বন্দি থেকে জীবনের ৮টা জন্মদিন পাড় করতে হয়েছে, মুসলমানের খুশির দিন ঈদও কাটাতে হয়েছে জেলে বসে। কিন্তু তাকে আদর্শচ্যুত করা যায়নি। ন্যায় ও সত্যের পক্ষে থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান।

বঙ্গবন্ধু তার কারাজীবনের অনেক ঘটনাই লিখেছেন কারাগারের রোজনামচায়। লিখেছেন বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামের খবরের আপডেট কীভাবে তিনি জানতেন। তিনি জেলে ছিলেন তবুও ভেবেছেন দেশের কথা, বাঙালি জাতির মুক্তির কথা। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন কারাগারের এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।