জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশকে সংকটমুক্ত করতে চাই

আজ থেকে ২৪ বছর আগে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবার রঙিন আশায় বুক বেঁধে এমনি করেই একদিন জনগণ ভােট দিয়েছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে, কিন্তু দিন না যেতেই দেখেছেন পাকিস্তানের জন্মলগ্নে জনগণের দেয়া সুস্পষ্ট ম্যান্ডেটের প্রতি এদেশের একশ্রেণির নেতার বিশ্বাসঘাতকতার ফলে সব স্বপ্ন তাদের ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছে। কেবল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষই নয়, সারাদেশের বারাে কোটি মানুষই আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নিজ দেশে পরবাসী। পরাধীন আমলেও এ চেহারা এদেশের মানুষের ছিল কি-না তা জনগণই তার বিচার করবেন। স্বাধীনতা-উত্তর জীবনে বিগত ২৩টি বছর ধরে সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, শোষণ ও বঞ্চনা এদেশের মানুষকে পােহাতে হয়েছে, তার সাক্ষী কেবল আমি বা আমার দলই নয়, সাক্ষী প্রত্যেকটি সাধারণ মানুষ। তাদের সন্তান সালাম-বরকত বুকের রক্ত ঢেলে রাজপথে যে সংগ্রামী চেতনায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছিল, তারই সূত্র ধরে এদেশের আরও শত শত সােনার সন্তানের আত্মদানের পরে হাজার হাজার ছাত্র-শ্রমিক-রাজনৈতিক কর্মীর অপরিসীম নির্যাতন ভােগের ফলশ্রুতিতে এদেশের মানুষ আজ তাদের অধিকার ফিরে পেতে চলেছে। জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের সৃষ্ট ফসল হিসেবে এইবারই সর্বপ্রথম দেশের আপামর মানুষের মতামত নিয়ে তাদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশের ভাবী শাসনতন্ত্র রচনার দায়িত্ব সমাধার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত দুই যুগের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণেরই মতামত নিয়ে পাকিস্তানের বুকে শােষণহীন, ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযােগী একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যে সুযােগ আজ এসেছে, তার যথাযথ সদ্ব্যবহার ও নির্ভুল প্রয়ােগের উপরই এদেশের আপামর জনসাধারণের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।

 

ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

পাকিস্তানের বিগত তেইশ বছরের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির ধারাক্রমে জাতি আজ এক চরম সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সঙ্কট থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য দেশব্যাপী যে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে তাকে উপলক্ষ করে প্রতিপক্ষীয় রাজনীতিকরা সেই পুরাতন প্রতিক্রিয়াশীল শােষক সম্প্রদায়ের প্রভুদেরকেই আবার ক্ষমতার আসনে বসাবার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। একটু তলিয়ে দেখলেই তাদের এ কারসাজি বুঝা কঠিন নয়। গণবিরােধী প্রতিক্রিয়াশীল শােষণ চক্রের এই বাঙালি দালালরা পাকিস্তানের জন্মাবধি নির্বাচন এড়িয়ে জনগণ থেকে নিজেদেরকে সযত্নে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে, কখনাে পশ্চাৎদ্বার দিয়ে, কখনাে বা লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে সরাসরি গিয়ে কুচক্রী ও কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণস্বার্থের সমাধির উপর নিজেদের ভাগ্যের ইমারত গড়েছেন, আবার আন্দোলন দেখলেই পিঠটান দিয়ে আরাম কেদারায় শুয়ে নতুন কোনাে সুযােগের প্রতীক্ষায় দিন গুজরান করেছেন। আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়। জনগণকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের মুরব্বিদের হয়ে গােপন অভিসন্ধি চরিতার্থ করা। কে না জানে যে, এবারকার নির্বাচনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে! নির্বাচিত হওয়ার সাথে সাথে জাতীয় পরিষদের সদস্যরা কিংবা কোনাে রাজনৈতিক দল ক্ষমতার মসনদে গিয়ে বসে পড়বেন, সে সুযােগ সেখানে নেই। ১২০ দিনের মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়নই হবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ। শাসনতন্ত্র প্রণয়ন সমাপ্ত করার পরই কেবল উঠতে পারে মসনদে বসার প্রশ্ন, তার আগে কখনােই নয়। নির্ধারিত মেয়াদের আগে শাসনতন্ত্র তৈরির কাজ সমাধা করতে না পারলে দেশ বিপর্যয়ের কোনাে অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে তা ভাবতেও দেশপ্রেমিক মাত্রেরই গা শিউরে উঠার কথা। এতে বিচলিত বােধ করবেন না কেবল তারাই যারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণকে দূরে সরিয়ে রেখে অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, ক্ষমতায় বহাল হওয়ার খােয়াব দেখেন অথবা সে কাজে সিদ্ধহস্ত। 

 

জনগণের ইচ্ছাই শেষ কথা

আওয়ামী লীগ জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বিশ্বাসী, আর বিশ্বাসী বলেই তাদের হয়ে জন্মাবধি তারা সংগ্রাম করে এসেছে। জনগণের অভিরুচি অনুযায়ী দেশ শাসিত হউক, এই কামনাই তাদের সংগ্রামী চেতনার মূল উৎস। তাই পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই জনগণের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেটের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দেশকে যখন বিপথে পরিচালিত করার ষড়যন্ত্র হয়, তখন তা নস্যাৎ করার জন্য তারা দেশব্যাপী জাতীয় ভিত্তিক সাধারণ নির্বাচন চেয়েছে। আর জনগণের প্রতি আস্থাহীন, দেশ ও দেশের সম্পদ লুট করে ভাগ্য গড়ার নীতিতে বিশ্বাসী আমাদের প্রতিপক্ষীয় একশ্রেণির রাজনীতিকরা কায়েমি স্বার্থ, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমাঞ্চলের সামন্ত নেতৃত্বে জোতদার, জায়গিরদারদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব প্রচেষ্টাই এ যাবত নস্যাৎ করে এসেছেন। আজও সে চেষ্টার বিরাম নেই। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা এই সােনার বাংলাকে শোষণের চারণক্ষেত্রে পরিণত করার দুরভিসন্ধিতে মেতে নেপথ্যের একশ্রেণির কুচক্রীরা যে মতলব এঁটেছিল, এই বাংলার মীর জাফররাই' বার বার সে মতলবের বাস্তবায়নে প্রধান হাতিয়ার হয়ে কাজ করে এসেছে, আর তাই এদেশের বারাে কোটি মানুষের আজ এ দুরবস্থা। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে কায়েমি স্বার্থ, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমাঞ্চলের সামন্তবাদী নেতৃত্বের চক্র ও চক্রান্তের প্রতিভূস্থানীয় যে মুসলিম লীগকে বাংলার বুক থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, কয়েকটি মাস না যেতেই বাংলার কোনাে সে ছদ্মবেশী সু-সন্তানরা সেই মুসলিম লীগ চক্রের সাথেই রাতারাতি হাত মিলিয়ে বাংলার সাত কোটি মানুষের স্বার্থবিরােধী শাসনতন্ত্র রচনায় মত্ত হয়েছিলেন, তাও কারও অজানা নয়। পরবর্তীকালে দেশে জাতীয় ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্বে রাতের অন্ধকারে ক্ষমতা দখল করে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান যখন এদেশের বারাে কোটি মানুষের শত অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে দেশব্যাপী কবরে শান্তি' প্রতিষ্ঠায় যত্নবান হয়েছিলেন, মােনেম খা জাতীয় বাংলার কোনাে সে মীরজাফর সেই স্বৈরাচারী শাসকের গললগ্ন হয়ে সােনার বাংলাকে অপর অঞ্চলের উপনিবেশ তথা শুশানে পরিণত করার চক্রান্ত বাস্তবায়নের পবিত্র দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট ছিলেন, যে কাহিনিরও পুনরাবৃত্তির প্রয়ােজন করে না।

 

বাংলার করুণ ইতিহাস

তাই বলি, বাংলা আর বাঙালির ইতিহাস- সিরাজউদ্দৌলা বনাম মীরজাফরের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস- বাংলার আপামর মানুষ বনাম জনাব মােনেম খাঁদেরই ইতিহাস। এ ইতিহাস বড় করুণ, বড় মর্মন্তুদ। এ ইতিহাস আবার গৌরবদীপ্তও বটে। বাংলার কচি-প্রাণ সালাম-বরকতের তপ্ত তাজা রক্তের পিচ্ছিল পথে নূরুল আমীনের, আর সার্জেন্ট জহুর-মনুমিয়া-আসাদ-শম্ভ আলাউদ্দিন আর আনােয়ারাদের শােকসন্তপ্ত মাতা-পিতা-ভ্রাতা-ভগিনীর তপ্ত অশ্রুর রােষানলে মােনেম খাদের ক্ষমতার আসনচ্যুতিও এদেশের ইতিহাসের কত গৌরবােজ্জ্বল অধ্যায়। তবু শিক্ষা তাদের হয়নি। হয়তাে বা অতীতে যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে এ দেশকে কায়েমি স্বার্থের অবাধ শােষণ ক্ষেত্রে পরিণত করে রেখেছিলেন আপনি, আমিও সে ইতিহাস থেকে কোনাে শিক্ষা নিতে পারিনি। সে শিক্ষা যদি তাদের হতাে; অথবা দেশবাসী যদি তা থেকে কোনাে শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হতেন তাহলে ১৯৬৯-এর প্রচণ্ড গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেদিন যারা নিজ নাম-ঠিকানা গােপন করে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁরা আজ আবার তাদেরই কথিত এদেশের গরু-ছাগলের দরবারে ভােটপ্রার্থী হন বা হতে পারেন কোন দুঃসাহসে! আমার বিচারে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিচার-বুদ্ধির প্রতি এ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, এক মহা অগ্নি-পরীক্ষা। এ চ্যালেঞ্জের জবাব জনসাধারণ কীভাবে দিবেন, এ অগ্নি-পরীক্ষায় কীভাবেই বা তারা উত্তীর্ণ হতে চান, তা তাঁদেরই বিবেচ্য।

তবে আমি যা বুঝি, আমার দলীয় সহকর্মীরা যা বুঝেন অথবা এদেশের সংগ্রামী ছাত্র, কৃষক ও শ্রমিক সমাজ যা বুঝেন, এক কথায় তা হলাে এই যে, এবারকার সাধারণ নির্বাচনই বাংলার সাড়ে সাত কোটি তথা সারাদেশের বারাে কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের প্রথম ও শেষ সুযােগ। গডড়ালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে কেউ যদি ভেবে থাকেন ভবিষ্যৎ বংশধরদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধানে তিনি সক্ষম হবেন, তবে ভুল করবেন নিঃসন্দেহে। আর সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হয়তাে বা কোনােদিনই আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। জনগণের এত দিনের সংগ্রাম, সাধনা, ত্যাগ ও তিতিক্ষার পর দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব ও সুযােগ আবারও যদি সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক নীতিবিরােধী সেই একই পুঁজিবাদী, ধনকুবের, দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থশিকারী, আমলাতন্ত্র বা একনায়কত্ববাদের হাতে চলে যায় তাহলে দেশ ও দশের সর্বনাশ অবধারিত। আর বয়স্ক ভােটাধিকার ভিত্তিক আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকালে জনগণ ভােটাধিকারটুকুর যথাযথ সদ্ব্যবহার ও নির্ভুল প্রয়ােগের মাধ্যমে কুচক্রীদের হাত থেকে সে দায়িত্ব ও সুযােগ যদি ছিনিয়ে আনতে পারেন তবেই দেশ ও দশের কল্যাণ । এই কারণেই আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জাতীয় পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিটি আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে।

 

মুক্তকণ্ঠের আওয়াজ চাই

ভুললে চলবে না যে, পাকিস্তানে এবারই সর্বপ্রথম জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধিদের দ্বারা এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের মূল সম্পদ শাসনতন্ত্র রচিত হতে চলেছে। বাংলাকে শােষণের হাত থেকে বাঁচাতে হলে, এ দেশের বারাে কোটি মানুষকে সত্যিকার মুক্তির সন্ধান দিতে হলে চাই মুক্তকণ্ঠের আওয়াজ- সে আওয়াজ তুলতে হবে বাংলারই জনপ্রতিনিধিদের। পশ্চিম পাকিস্তানের অসহায় মানুষের ভােটে যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন তাদের অধিকাংশই জীবনে সামন্ত স্বার্থেরই প্রতিভূ।

তাদের কণ্ঠে কখনাে দেশের কৃষক শ্রমিক তথা সর্বহারা মানুষের স্বার্থের কথা ধ্বনিত হতে পারে না। বরং নিজেদের স্বার্থেই তারা চাইবেন গণস্বার্থকে দাবিয়ে রাখতে। জাতীয় পরিষদে তাদেরকে মােকাবিলা করে এদেশের আপামর মানুষের স্বার্থ ও অধিকার ছিনিয়ে এনে পাকাপাকিভাবে শাসনতন্ত্রে স্থান দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে কেবল বাংলার মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঐক্য। ভিন্ন ভিন্ন দলের পৃথক চিন্তাধারার প্রতিনিধিদের কণ্ঠে বেসুরাে আওয়াজ উঠতে বাধ্য। তার উপর রয়েছে। বাংলার মীরজাফরদের ভূমিকা। ইতােমধ্যেই অন্যান্য রাজনৈতিক দল কেউ একশত, কেউ বা ৩০/৪০টি আসনে দলীয় প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে এসব দলের সব কয়টিরই শিকড় পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশের জন্য তাদের এমনই দরদ যে, পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য আপ্রাণ প্রয়াস পেলেও, বাংলাদেশের বেলায় ‘যে কয়টি আসন পাওয়া যায় ভালাে এই নিয়মেই তারা নির্বাচনে নামছেন। তারা যে বাংলার তথা আপামর জনসাধারণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণে ইচ্ছুক নয়, তার সবচাইতে বড় প্রমাণ তারা নির্বাচনে বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোনাে চেষ্টাই করতে চান না। তারা জানেন, যেন তেন প্রকারে গুটিকয়েক আসন যদি তারা এখান থেকে পার করিয়ে নিতে পারেন তাহলে তাদেরকে বগলদাবা করে যেকোনাে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে বাংলাকে সংখ্যালঘু করে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের পথ ঠিকই করে নিতে পারবেন । এ দুরভিসন্ধি সম্পর্কে তাই বাংলার মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

 

সত্যের ভিত্তিতে ছয় দফা

আরেকটি প্রশ্ন হলাে, নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ অনেক দলই বাংলার জন্য কুম্ভীরা বর্ষণ করে চলেছেন। কিন্তু কীভাবে দেশের দু'অঞ্চলের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে, কী করে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষুদ্রতর প্রদেশগুলির মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, তার কোনাে কর্মসূচিই জনসাধারণের সামনে তারা ঘােষণা করেননি। ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতি আওয়ামী লীগ করে না। রাজনীতির অঙ্গনে ঢাক ঢাক গুড় গুড় নীতিতেও আমরা বিশ্বাসী নই। তাই, জনগণের জন্য আমরা যা চাই তা সুস্পষ্ট ভাষায় সরাসরি ঘােষণা করি। এ কারণে আমাদের বহু নির্যাতনও পােহাতে হয়, কখনাে রাষ্ট্রদ্রোহী", কখনাে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী আবার কখনাে বিদেশি চরের আখ্যাও আমাদের পেতে হয়েছে। তবু জনগণের জন্য যা সত্য ও সুন্দর বলে জেনেছি তা থেকে আমরা কখনাে বিচ্যুত হইনি। রক্তচক্ষুর সামনে। সত্যকে বর্জন করিনি রক্তচক্ষু দিয়েই তার জবাব দিয়েছি। দীর্ঘ তেইশ। বছর অত্যাচার, নির্যাতন, শাসন, শােষণ আর বঞ্চনার তিক্ত অভিজ্ঞতার আলােকে বিচার করে সর্বশেষ কর্মসূচি হিসাবে আমার দল ৬ দফাকে জাতির সামনে পেশ করেছে। এদেশের সংগ্রামী ছাত্র সমাজও ৬ দফার সারবত্তা অনুধাবন করে তাদের ১১ দফা কর্মসূচিতে ৬ দফাকে স্থান দিয়ে সংগ্রাম করে চলেছে। পাকিস্তানের ১২ কোটি মানুষের সত্যিকার মুক্তিচিন্তার স্বর্ণফসল হিসেবে কাউন্সিল অধিবেশনে ও কর্মীসমাজে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় ৬ দফা। এই কর্মসূচিকে আওয়ামী লীগ কারও উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়নি। ৬ দফার গুণাগুণ বিচারের ভার আমরা জনগণের উপরই ছেড়ে দিয়েছি। ৬ দফা বাংলার শ্রমিক-কৃষক-মজুর-মধ্যবিত্ত তথা আপামর মানুষের মুক্তির সনদ, ৬ দফা শােষকের হাত থেকে শােষিতের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছিনিয়ে আনার হাতিয়ার, ৬ দফা মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধদের নিয়ে গঠিত বাঙালি জাতির স্বকীয়। মহিমায় আত্মপ্রকাশ আর নির্ভরশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি, ৬ দফা বাঙালির আত্মমর্যাদায় সম্মানজনক আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবি, ৬ দফার সংগ্রাম আমাদের জীবন-মরণের সংগ্রাম। তাই এবারকার নির্বাচনে আমার দলের জয়ের অর্থ ৬ দফারই জয় আর ৬ দফার জয়ের অর্থ এদেশের লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষের মুক্তি সংগ্রামের জয়। 

 

লেবেলসর্ব ইসলাম নয়

আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। একথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য লেবেলসর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হজরত রসুলে করীম (সঃ)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমােঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়, অত্যাচার, শােষণ, বঞ্চনার পৃষ্ঠপােষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মােনাফেকদেরই বিরুদ্ধে। যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সে দেশে ইসলাম বিরােধী আইন পাসের সম্ভাবনার কথা ভাবতে পারেন কেবল তারাই ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফায়স্থা করে তােলার কাজে।

কথা তােলা হয়েছে যে, নির্বাচনি ঐক্যজোটে সম্মত না হয়ে আমরা বাংলার স্বার্থেরই ক্ষতি করছি। এর উত্তর হলাে : বাংলার স্বার্থের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য আমরা নির্বাচনি ঐক্যজোটে আর বিশ্বাসী নই। অতীতে বহুবার, এমনকি ১৯৫৪ সালে ঐক্যজোট গঠনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। বাংলার মানুষ গভীর আশায় বুক বেঁধে যুক্তফ্রন্টকে জয়যুক্ত করেছিল, কিন্তু আমরা দেখেছি যুক্তফ্রন্টের নাম নিয়েই আওয়ামী লীগ সদস্যরা ছাড়া আর সব অঙ্গ দলের সদস্যরাই কেন্দ্রের সেই ধিকৃত দলটিতেই ভিড়ে গিয়েছেন, যে দলকে দু'দিন আগে বাংলার আপামর মানুষ বাংলার মাটি থেকে সমূলে উৎখাত করেছে। ফলত সর্বনাশ হয়েছে বাংলার আর বাঙালির, সর্বনাশ হয়েছে এদেশের কোটি মানুষের। তাই এবার আর আমরা ভিন্ন চিন্তাদর্শের মানুষের সাথে ঐক্যজোট গঠন করে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাইনে। এবার আমাদের কথা হলাে কর্মসূচি বলতে কিছু থেকে থাকলে তার ভিত্তিতে জনগণের দরবারে যান, জনগণ আপনাকে গ্রহণ করলে জাতীয় পরিষদে গিয়ে প্রয়ােজন হলে আপনার সাথে ঐক্যজোট গঠন করব, এখন নয়।

 

আমার জীবনের স্বপ্ন

জাতির এ মহাসন্ধিক্ষণে বাংলার জননায়ক শেরে বাংলা পরলােকে, হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দীও আজ আমাদের মাঝে সেই । মানিক ভাই-এর ক্ষুরধার লেখনীও আজ চিরতরে স্তব্ধ। প্রাচীন নেতাদের মধ্যে যারা বেঁচে আছেন তাঁরা অতীতের নিয়মে এখনও পশ্চিমাঞ্চলের সেই কায়েমি স্বার্থের কাছে নিজেদের বিকিয়ে রেখেছেন, নয়তাে নির্জীব নিষ্কর্মা হয়ে বসে পড়েছেন, অন্যের সলা-পরামর্শে বশীভূত হয়ে কথায় ও কাজে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। শত প্রতিকূলতার মুখে গর্দান খাড়া রেখে কথা বলার মতাে নেতৃত্বের আজ বড় অভাব। নিজের সীমাবদ্ধ সামর্থ্যে দেশবাসীর খেদমত করতে গিয়ে অতীতে বহু পরীক্ষার আমাকে সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার সংগ্রামী জীবনের স্বপ্ন ও সাধনার আলােকে বিচার করে নিশ্চিতই আজ আমি বুঝতে পারছি ভাগ্যাহত বাংলার এদেশের আপামর তথা সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বাসনাকে সার্থক রূপ দেওয়ার যে বিরাট গুরুদায়িত্ব আজ আমাদের সামনে, সে দায়িত্ব আজ আমাকেই স্কন্ধে তুলে নিতে হচ্ছে। এদেশের ভাগ্যাহত মানুষের ভাগ্য প্রণয়নের দায়িত্ব বাংলার মাটি হতে অঙ্কুরিত আওয়ামী লীগকেই গ্রহণ করতে হবে। আমি ও আমার দল সে দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, কেবল প্রয়ােজন জনগণের দোয়া আর শুভেচ্ছা যা কি-না আমাদের এবারের চলার পথে একমাত্র পাথেয়।

ব্যক্তিগত কৈফিয়ত হিসেবে জনগণের খেদমতে একটিই মাত্র আমার বক্তব্য : নিজের জীবনের বিনিময়ে যদি এদেশের ভাবী নাগরিকদের জীবনকে কণ্টকমুক্ত করে যেতে পারি, আজাদী আন্দোলনের সূচনাতে এদেশের মানুষ মনের পটে যে সুখী-সুন্দর জীবনের ছক এঁকেছিল, সে স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণের পথ কিছুটাও যদি প্রশস্ত করে যেতে পারি, তাহলেই আমার সংগ্রাম সার্থক মনে করব।

আমি ক্ষমতার প্রত্যাশী নই। তবু আমার প্রতিপক্ষেরা আমাকে এ অপবাদ দিয়ে চলেছেন। বিগত ২৩ বৎসর ধরে ক্ষমতার আসন আমি কবে কখন আঁকড়ে ধরেছি তার বিবরণ তারা দেন না। বিগত গােল টেবিল বৈঠকের সময় আমাকে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমি তা দু'পায়ে ঠেলে দিয়েছি। এতে আমার প্রতিপক্ষের বন্ধুদের অনেকে রুষ্টও হয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত লাভালাভ বা স্বার্থের বখরায় শরিক হয়ে দেশবাসীর স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া আমার রাজনীতির লক্ষ্য কোনােদিন ছিল না, আজও নাই। তাই রুষ্ট হলেও প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রলােভনের মুখে বাংলা ও বাঙালির স্বার্থের প্রশ্নে নিজ বিবেককে আমি বিকিয়ে দিতে চাইনি। তাদের দৃষ্টিতে এ আমার অপরাধ হতে পারে; কিন্তু আমার মনে হয়, দেশবাসীর দৃষ্টিতে নয়।

 

লােকশক্তির প্রত্যাশী

ক্ষমতার প্রত্যাশী আমি নই, তবে শক্তির প্রত্যাশী আমি বটে- কায়েমি স্বার্থসম্পন্ন অনিচ্ছুক মহলের হাত থেকে দেশবাসীর স্বার্থ ছিনিয়ে আনতে শক্তি আমরা চাই-ই চাই। সে শক্তি জোগাতে পারেন কেবল জনগণই। এ কারণে জনগণের খেদমতে একটিই মাত্র আমার প্রার্থনা : জাতীয় পরিষদে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষের হয়ে এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলে বাংলা ও বাঙালির স্বার্থ ও অধিকার যাতে আমরা আদায় করে আনতে পারি, তার জন্য জাতীয় পরিষদে বাংলার ১৬৯টি আসনের প্রত্যেকটি আসনে জনগণ আওয়ামী লীগ মনােনীত প্রার্থীকেই ভােট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। কারণ জনগণের শাসনতন্ত্র চাহিদামতাে পাস করিয়ে আনতে হলে অনিচ্ছুক প্রতিপক্ষের মােকাবিলায় আমার চাই নির্ভেজাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিজয়ের চাবিকাঠি। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি তারা আমাকে জাতি, ধর্ম ও দলমত নির্বিশেষে দেন, তাহলে আমি ওয়াদা দিচ্ছি তাদের স্বার্থ ও অধিকার আমি আদায় করে আনবই। আর যদি আপনাদের বিচারে ভুল হয়, আবার যদি পার্লামেন্ট গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দরুন বাংলার প্রতিনিধিরা দলে দলে ভাগ হয়ে বসে বেসুরাে আওয়াজ তুলেন, তাহলে হাতে পেলেও সবই আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে, আর তার অর্থ হবে এদেশের বারাে কোটি মানুষ ও তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের সর্বনাশ । এ সর্বনাশে আপনি আমি জ্ঞানত শরিক হতে পারি কি-না, তা বিচারের ভার আপনাদের উপরই আমি ছেড়ে দিচ্ছি।

বাংলার মীরজাফরদের সম্পর্কে আমি আপনাদের সজাগ করে দিয়ে এই কথাই বলতে চাই যে, তেইশটি বছরের অত্যাচার, অবিচার, শােষণ ও শাসনে বাংলার মানুষ আজ নিঃস্ব, সর্বহারা। ক্ষুধায় তাদের অন্ন নেই, পরনে নেই বস্ত্ৰ, সংস্থান নেই বাসস্থানের। বাংলার অতীত আজ লুপ্ত, বর্তমান অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। জাতির এহেন দুর্দিনে বাংলার ভবিষ্যৎ সন্ত নিদের বাঁচাবার দায়িত্ব আপনার। জাতীয় জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব পালনের সুযােগ যদি আপনারা আমাকে ও আওয়ামী লীগকে দেন তাহলে এদেশের কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-মধ্যবিত্ত, যারা আজ সর্বস্ব হারিয়ে রিক্ত ও শূন্য হস্ত, তাদের মুখে ইনশাআল্লাহ আমরা হাসি ফুটাতে পারব এ বিশ্বাস আমাদের আছে। বাংলার সকল অধিবাসী- সে সংখ্যাগুরুই হউক বা সংখ্যালঘুই হউক সকলকেই আজ দেশাত্মবােধ নিয়ে জেগে উঠতে হবে, মরণপণ করে বাংলার মান-ইজ্জত রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসতে হবে। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ঢেলে দিয়ে আজও যারা ঘুমিয়ে আছেন তাদেরকে এবার ডাক দিয়ে কেবল বলে যেতে চাই : জাগাে বাঙালি জাগে। তােমাদের জাগরণেই এদেশের বারো কোটি মানুষের মুক্তি।

সামন্ত নেতৃত্ব-লাঞ্ছিত পশ্চিম পাকিস্তানের আপামর মানুষও আজ তােমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তােমরা তাদের নিরাশ করাে না।

জয় জনগণের জয় ।

জয় বাংলার জয় !!

 

সকলের সমান অধিকার, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব

যে সংকট আজ জাতিকে গ্রাস করতে চলেছে তার প্রথম কারণ, দেশবাসী রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। দ্বিতীয়, জনগণের এক বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থনৈতিক বৈষম্যের কালে পতিত। তৃতীয়, অঞ্চলে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্য সীমাহীন অবিচারের উপলব্ধি জন্মেছে। প্রধানত এগুলােই বাঙালিদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণ। পশ্চিম পাকিস্তানের অবহেলিত মানুষেরও আজ একই উপলব্ধি।

আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানের একটা সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ করা হয়েছে। দেশে প্রকৃত প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সেই গণতন্ত্র মানুষের সকল মৌলিক স্বাধীনতা শাসনতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিত করা হবে। আমাদের মেনিফেস্টোতে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংস্থা, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু বিকাশের রূপরেখা নির্দেশ করা হয়েছে। সংবাদপত্র ও শিক্ষার পূর্ণ স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাসী। সমাজে ক্যান্সারের মতাে যে দুর্নীতি বিদ্যমান, তাকে নির্মূল করতে আমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

 

অসহনীয় অবিচার

বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শােষণ ও অবিচারের যে অসহনীয় কাঠামাে সৃষ্টি করা হয়েছে, অবশ্যই তার আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হবে। জাতীয় শিল্প সম্পদের শতকরা ৬০ ভাগের অধিক আজ দু'ডজন পরিবার করায়ত্ত করেছে। ব্যাংকিং সম্পদের শতকরা ৮০ ভাগ এবং বীমা সম্পদের শতকরা ৭৫ ভাগ এ দুই ডজন পরিবারের কুক্ষিগত। ব্যাংকের লগ্নিকৃত অর্থের শতকরা ৮২ ভাগ আজ মােট জমাকারীদের মাত্র শতকরা ৩ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেশে যে করপ্রথা কায়েম রয়েছে, তা বিশ্বের সবচাইতে পশ্চাৎমুখী ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যখন প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে মােট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ৬ ভাগ আদায় করা হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে মােট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ২ ভাগ অর্থ আদায় হয়। অপর পক্ষে, লবণের মতাে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির ওপরও নিপীড়নমূলক পরােক্ষ কর বসানাে হয়েছে। সংরক্ষিত বাজার, ট্যাক্স হলিডে, বােনাস ভাউচারের বিপুল পরিমাণে সাবসিডি প্রদান এবং কৃত্রিমভাবে নিম্নহারে বিদেশি মুদ্রার ঋণ, অর্থ বরাদ্দ প্রভৃতি ব্যবস্থা একচেটিয়াবাদ ও কার্টেল প্রথার সুযােগ করে দিয়েছে।

ছিটেফোটা ভূমি সংস্কার সত্ত্বেও সামন্ত প্রভুরা রাজকীয় ঐশ্বর্যের অধিকারী রয়েছেন। তাঁরা সীমাহীন সুযােগ-সুবিধা ভােগ করছেন। তাঁদের সমৃদ্ধি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। কিন্তু তারই পাশাপাশি অসহায় দরিদ্র কৃষকের অবস্থার দিন দিন অবনতি ঘটেছে। কেবলমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে জনসাধারণ দিনের পর দিন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ৯০ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ আজ বেকার। জীবনযাত্রার দ্রুত ব্যয় বৃদ্ধির সম্পূর্ণ চাপ এসে পড়েছে শিল্প-শ্রমিক ও মেহনতি সম্প্রদায়ের ওপর। মুদ্রা মজুরি যা বাড়ছে, তার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। জীবনযাত্রার সীমাহীন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ স্কুল-কলেজের শিক্ষক, স্বল্প বেতনভুক্ত কর্মচারী, বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীরা আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন।

 

ভয়াবহ বৈষম্য

অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে গত বাইশ বছরে সরকারি রাজস্ব খাতের মােট ব্যয়ের মাত্র পনেরাে শত কোটি টাকার মতাে (মােট ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশ) এই বাংলায় খরচ করা হয়েছে। অথচ এর পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ করা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশের সর্বমােট উন্নয়ন ব্যয় খাতে বাংলায় মােট ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিশ বছরে পশ্চিম পাকিস্তান মাত্র তেরাে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি করেছে। বাংলার তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে তিনগুণ বেশি বিদেশি দ্রব্য আমদানি করা হয়েছে। নিজস্ব বিদেশি মুদ্রা আয়ের চাইতেও পশ্চিম পাকিস্তান বাড়তি দু'হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি দ্রব্য আমদানি করতে পেরেছে। তার কারণ বাংলায় অর্জিত পাঁচশাে কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করেছে। তার উপরেও সর্বপ্রকার বিদেশি সাহায্যের শতকরা ৮০ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যবহৃত হয়েছে ।

 

চাকরিতে বাঙালির বঞ্চনা

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রের পরিসংখ্যানও ঠিক একই রকমের মর্মান্তিক। স্বাধীনতার তেইশ বছর গত হয়েছে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে বাঙালির সংখ্যা আজও মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। দেশরক্ষা সার্ভিসে বাঙালির সংখ্যা মাত্র ১০ ভাগেরও কম। সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ প্রকট বৈষম্যের ফলে বাংলার অর্থনীতি আজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের মুখে। বাংলার বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলে দুর্ভিক্ষজনিত অবস্থা বিরাজ করছে। জনগণকে শুধুমাত্র অনাহারের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য ১৭ লক্ষ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে যে মুদ্রাস্ফীতি প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে, তার শিকারে পরিণত হয়ে চলেছে বাংলার অসহায় মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বাংলায় অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের মূল্য শতকরা ৫০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি। পশ্চিম পাকিস্তানে যে মােটা চাউলের দাম প্রতিমণ ২০ থেকে ২৫ টাকা সেক্ষেত্রে এই বাংলায় ঐ একই চাউলের দাম গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বাংলায় যে আটার দাম প্রতিমণ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, পশ্চিম পাকিস্তানে তা ১৫ থেকে ২০ টাকা। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতি সের সরিষার তেলের দাম মাত্র আড়াই টাকা, কিন্তু বাংলায় প্রতি সের তেলের দাম পাঁচ টাকা। করাচিতে যে সােনার দাম প্রতি ভরি ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা, ঢাকায় সে সােনার মূল্য প্রতি ভরি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। তারপরেও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলায় সােনা আনার ব্যাপারে কাস্টমস-এর বিধিনিষেধ আরােপ করা হয়েছে।

গত বাইশ বছরে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের অর্থনীতির যে কাঠামাে গড়ে তুলেছেন- এসব অবিচার তারই পুঞ্জীভূত ফলশ্রুতি। এ অবিচার দূর করার 1. সাধ্য কেন্দ্রীয় সরকারের নেই- এই সত্যটি প্রমাণিত হয়েছে চতুর্থ পাঁচসালা পরিকল্পনায়। কেন্দ্রীয় সরকার যত বড় শক্তিশালী হােক না কেন, অতীতের অন্যায়-অবিচার দূরীকরণে সে যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ- চতুর্থ পাঁচসালা পরিকল্পনার ব্যয় বরাদ্দে সে ব্যর্থতার স্বীকৃতি লিপিবদ্ধ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচি, যে কর্মসূচি ছাত্র সমাজের ১১ দফা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সে কর্মসূচি আঞ্চলিক অন্যায়-অবিচারের বাস্তব সমাধানের পথনির্দেশ করেছে। কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রে যেখানে বাংলার প্রতিনিধিত্ব মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ এবং দেশে যে ধরনের শাসন ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে তাতে কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কাছ থেকে সুবিচার আশা করা যায় না। বাংলা ও অন্যান্য অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা বৃহত্তর ব্যয় বরাদ্দ আদায়ের চেষ্টা করলে আঞ্চলিক উত্তেজনাই বৃদ্ধি পাবে এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে ফেডারেল সরকারের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। এ অবস্থায় সমস্যাসমূহের একমাত্র সমাধান হতে পারে শাসনতান্ত্রিক কাঠামাের পুনর্বিন্যাস করে এবং ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে আওয়ামী লীগের ৬ দফার ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে। প্রস্তাবিত এ স্বায়ত্তশাসনকে পুরােপুরি কার্যকরী করার জন্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও অবশ্যই দিতে হবে। এ জন্যেই মুদ্রা ব্যবস্থা ও অর্থনীতি এবং বিদেশি মুদ্রা অর্জনের ওপর ফেন্ডারেশনের ইউনিটগুলির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দানের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই গুরুত্ব দিচ্ছি। এ কারণে আমরা মনে করি যে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ঋণসমূহের ব্যাপারে আলাপ-আলােচনার ক্ষমতাও ফেডারেশনের ইউনিট সরকারগুলাের হাতে অর্পণ করা উচিত। এভাবে আমরা কেন্দ্রকে সন্দেহ, সংশয় ও বিভেদ সৃষ্টির অভিযােগের আওতার উর্ধ্বে রাখতে চাই। ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে অর্থনৈতিক ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান, ফেডারেশন সরকারকে পররাষ্ট্র বিষয়ক, দেশরক্ষা বিষয় ও নিরাপত্তামূলক শর্তসাপেক্ষে মুদ্রা ব্যবস্থার দায়িত্ব দিয়ে একটা ন্যায়সঙ্গত, ভারসাম্যমূলক ফেডারেল রাষ্ট্র কায়েম হতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করি । আমাদের ফেডারেল সরকার পরিকল্পনায় নিখিল পাকিস্তান সার্ভিস ব্যবস্থার বিলােপ সাধন করা হবে এবং ফেডারেল সার্ভিস ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে সকল অঞ্চল থেকে ফেডারেল চাকরিতে লােক নিয়ােগ করা হবে। আমরা আরাে বিশ্বাস করি যে, ফেডারেশনের ইউনিটগুলি যদি মিলিশিয়া অথবা প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন করে, তবে তারা কার্যকরীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সাহায্য করতে সক্ষম হবে। আমাদের প্রস্তাবিত ফেডারেল পরিকল্পনা সংশয় ও বিরােধের অবসান ঘটিয়ে শক্তিশালী পাকিস্তানের নিশ্চয়তা বিধান করবে। যে অঞ্চলের মানুষ অপর অঞ্চলকে উপনিবেশ বা বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে চান বােধগম্য কারণেই তারা আমাদের এ প্রস্তাবিত পরিকল্পনার বিরােধিতা করবেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের পরিকল্পনা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের পূর্ণ সমর্থন পাবে।

আমাদের বিশ্বাস, শাসনতান্ত্রিক এ কাঠামাের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশে একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটানাে সম্ভব এবং অন্যায়-অবিচার ও শােষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তােলা সম্ভব হবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়ােজন মেটানাের জন্য দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের প্রয়ােজন দেখা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য দেশবাসীর কঠোর পরিশ্রম ও বিপুল ত্যাগ স্বীকারের প্রয়ােজন। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশবাসী তখনই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় আত্মনিয়ােগ করবেন, যখন ত্যাগ স্বীকারের সাথে সাথে অথনৈতিক সমৃদ্ধি সকল শ্রেণি সকল অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করার আশ্বাস আমরা দিতে পারবাে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অংশ নিশ্চিত করার জন্যে অর্থনৈতিক কাঠামােতে অবশ্যই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। জাতীয়করণের নামে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলােসহ দুর্নীতির মূল চাবিকাঠিগুলােকে জনগণের মালিকানায় আনা অত্যাবশ্যক বলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সাধিত হবে জনগণের মালিকানায়।

নতুন ব্যবস্থায় শ্রমিকগণ শিল্প ব্যবস্থাপনায় ও মূলধন পর্যায়ে অংশীদার হবেন। বেসরকারি পর্যায়ে এর নিজস্ব ভূমিকা পালন করার সুযােগ রয়েছে। একচেটিয়াবাদ ও কার্টেল প্রথা সম্পূর্ণভাবে বিলােপ সাধন করতে হবে। কর ব্যবস্থাকে সত্যিকারের গণমুখী করতে হবে। সৌখিন দ্রব্যাদির ব্যাপারে কড়া বিধিনিষেধ আরােপ করতে হবে। ক্ষুদ্রায়তন ও কুটির শিল্পকে ব্যাপকভাবে উৎসাহ দিতে হবে। কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁতিদের ন্যায্যমূল্যে সূতা ও রং সরবরাহ করতে হবে। তাদের জন্যে অবশ্যই বাজারকরণ ও ঋণ দানের সুবিধা করে দিতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্রাকৃতির শিল্প গড়ে তুলতে হবে। গ্রামে গ্রামে এসব শিল্পকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে, যার ফলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিভিন্ন প্রকার শিল্প সুযােগ পৌছায় এবং গ্রামীণ মানুষের জন্যে কর্মসংস্থানের সুযােগ সৃষ্টি হয়। এযাবত বাংলার আঁশ পাটের প্রতি ক্ষমাহীন অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক বিনিয়ােগ হার এবং পরগাছা ফড়িয়া ব্যাপারীরা পাটচাষিদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করেছে। পাটের মান, উৎপাদনের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির বিশেষ প্রয়ােজন দেখা দিয়েছে। পটি ব্যবসা জাতীয়করণ, পাটের গবেষণার উপরে বিশেষ গুরুত্ব আরােপ এবং পাট উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে পাট সম্পদ সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারে। তুলার প্রতিও একই ধরনের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়ােজন। সে জন্য আমরা মনে করি, তুলা ব্যবসাও জাতীয়করণ করা অত্যাবশ্যক। তুলার মান ও উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করার প্রয়ােজন রয়েছে। বিগত সরকারগুলাে আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল চা, ইক্ষু ও তামাকের উৎপাদনের ব্যাপারেও যথেষ্ট অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। এর ফলে এসব অর্থকরী ফসলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

একটা স্বল্প সম্পদের দেশে কৃষি পর্যায়ে অনবরত উৎপাদন হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা যেতে পারে না। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষিদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। কৃষি বিপ্লব অত্যাবশ্যক

প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের গোটা কৃষি ব্যবস্থাতে বিপ্লবের সূচনা অত্যাবশ্যক। পশ্চিম পাকিস্তানে জায়গিরদারি, জমিদারি, সরদারি প্রথার অবশ্যই বিলুপ্তি সাধন করতে হবে। প্রকৃত কৃষকের স্বার্থে গােটা ভূমি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভূমি দখলের সর্বোচ্চ সীমা অবশ্যই নির্ধারিত সীমার বাইরের জমি এবং সরকারি খাস ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। কৃষি ব্যবস্থাকে অবশ্যই আধুনিকীকরণ করতে হবে। অবিলম্বে চাষিদেব বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে ভূমি সংহতি সাধনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সরকার এজন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

ভূমি রাজস্বের চাপে নিস্পৃষ্ট কৃষককুলের ঋণভার লাঘবের জন্যে। অবিলম্বে আমরা ২৫ বিঘা জমি পর্যন্ত জমির খাজনা বিলােপ এবং বকেয়া খাজনা মওকুফ করার প্রস্তাব করেছি। আমরা বর্তমান ভূমি রাজস্ব প্রথাও তুলে দেবার কথা ভাবছি।

প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বাধিক উন্নয়নের জন্যে বৈজ্ঞানিক তৎপরতা চালাতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের বন সম্পদ, ফলের চাষ, গাে-সম্পদ, হাঁস-মুরগির চাষ, দুগ্ধ খামার সর্বোপরি মৎস্য চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। পানি সম্পদ সম্পর্কে গবেষণা এবং নৌ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্যে অবিলম্বে একটি নৌ গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়ােজন। অর্থনৈতিক মৌল ভিত্তির যে প্রথম তিনটি স্তর, সেগুলােকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণকে অবশ্যই প্রথম কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জরুরি ব্যবস্থার ভিত্তিতে একটা সুসংহত ও সুষ্ঠু বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়ােজন। পশ্চিম পাকিস্তানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা দ্রুতগতিতে দূরীভূত করতে হবে। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিজলি সরবরাহ করতে না পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধিত হতে পারে না। একটি সম্প্রসারিত কর্মসূচি বাস্তবায়িত করে গ্রামে গ্রামে বিজলি সরবরাহ করতে হবে। এর দ্বারা পল্লি অঞ্চলে ক্ষুদ্রায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। পাঁচ বছরে আমরা এই বাংলায় পঁচিশশাে কিলােওয়াটস বিজলি উৎপাদন করতে চাই। রূপপুর আনবিক শক্তি এবং জামালগঞ্জের কয়লা প্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়িত করতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস অবিলম্বে পুরােপুরিভাবে কাজে লাগাতে হবে। তৃতীয় অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরিবহন ও যােগাযােগ ব্যবস্থা। যমুনা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে উত্তরবঙ্গের সাথে সরাসরি যােগাযােগ ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টিকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে সিন্ধু নদের উপর এবং বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও কর্ণফুলীর উপরেও সেতু নির্মাণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ নৌ ও সামুদ্রিক বন্দরের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সড়ক ও রেল ব্যবস্থার উপরও আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছি।

 

শিক্ষাই শ্রেষ্ঠ বিনিয়ােগ

সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তােলার জন্যে শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়ােগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়ােগ আর কিছু হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংলায় প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার পরিসংখ্যান একটা ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ জন অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর ১০ লক্ষেরও অধিক নিরক্ষর লােক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকেরও বেশি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযােগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়ােজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল শিক্ষকদের বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযােগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। ৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্যে একটা ক্রাশ প্রােগ্রাম চালু করতে হবে ও মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণির জন্যে খােলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিক্যাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ

জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ও উর্দু যাতে ইংরেজির স্থান দখল করতে পারে সে ব্যাপারে অবিলম্বে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যাপারে উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে। নাগরিক জীবনের সমস্যাবলির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবাে নিম্ন আয়ের লােকজন অমানুষিক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছেন। তথাকথিত ইপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টগুলি বিত্তবানদের জন্যে বিলাসবহুল আবাসিক এলাকা নির্মাণে ব্যস্ত। আর এদিকে বাস্তুহারা ও বিত্তহীনের দল এতটুকু আশ্রয়ের সন্ধানে মাথা কুটে ফিরছে। ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র নগরবাসীর সুযােগ সুবিধার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অল্প খরচে শহরে বাসগৃহ নির্মাণের ব্যবস্থার প্রয়োজন।

চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এক করুণ পরিবেশ বিদ্যমান। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ সমান্যতম চিকিৎসার সুযােগ থেকেও বঞ্চিত। প্রতি ইউনিয়নে একটি করে পল্লি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং প্রতি থানা সদরে একটি করে হাসপাতাল অবিলম্বে স্থাপন করা প্রয়ােজন। চিকিৎসা গ্র্যাজুয়েটদের জন্যে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রবর্তন প্রয়ােজন। পল্লি এলাকার জন্যে বিপুলসংখ্যক প্যারা মেডিকেল পার্সনেলদের ট্রেনিং দেয়া দরকার।

 

শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা

গণ-আন্দোলনের মতােই শিল্প শ্রমিকরা অর্থনীতি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকেন। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, যৌথ দরকষাকষি এবং ধর্মঘটের ব্যাপারে তাদের মৌলিক স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের নিজেদের এবং সন্তানদের বেঁচে থাকার মতাে মজুরি, বাসগৃহ, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযােগের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার খর্বকারী সকল শ্রম আইন বাতিল করতে হবে। শিল্পকারখানা শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা দানের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি আশা করা যায়। সমাজের চাহিদা মেটাতে হলে অর্থনীতির সকল খাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে।

অর্থনীতির সর্বত্র মজুরির কাঠামাে ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করতে হবে । ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির গ্রাস থেকে নিম্ন বেতনভুক কর্মচারী ও অল্প উপার্জনশীল ব্যক্তিদের বাচাবার জন্য দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীলতা আনতে হবে।

সকল নাগরিকের সমান অধিকারে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিশ্চয় জানা আছে যে, আমরা সব সময়ই সাম্প্রদায়িকতার বিরােধিতা করে আসছি। সংখ্যালঘুরাও অন্যান্য নাগরিকদের মতােই সমান অধিকার ভােগ করবে। আইনের সমান রক্ষাকবচ সর্বক্ষেত্রেই পাবে। উপজাতীয় এলাকা যাতে অন্যান্য এলাকার সাথে পুরােপুরি সংযােজিত হতে পারে, তারা যাতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে অপর নাগরিকদের মতােই সুযােগ-সুবিধা ভােগ করে, এজন্য উপজাতীয় এলাকা উন্নয়নের ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় দ্বীপসমূহ এবং উপকূলবর্তী এলাকায় বসবাসকারীরা যাতে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, সেজন্যে তাদের সম্পদের সদ্ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়ােজন।

জাতীয় জীবনের সাথে মােহাজেরদের একাত্ম হয়ে যাওয়া উচিত। এর ফলে স্থানীয় জনগণের সাথে মিলেমিশে সর্বক্ষেত্রে তারা স্থানীয় জনগণের মতােই সমান সুযােগ-সুবিধা ভােগ করতে পারবেন।

 

সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রয়ােজন

৬ দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইসলামকে বিপন্ন করে তুলেছে। বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানাে হচ্ছে সে মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি শেষবারের মতাে আহ্বান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রত্যাশী কোনাে কিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারে না।

পররাষ্ট্রনীতির মতাে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে। আজ বিশ্ব জুড়ে যে ক্ষমতার লড়াই চলছে সে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা কোনােমতেই জড়িয়ে পড়তে পারি না। এজন্য আমাদের অবশ্যই সত্যিকারের স্বাধীন এবং জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে ।

আমরা ইতােমধ্যেই সিয়াটো, সেন্টো ও অন্যান্য সামরিক জোট থেকে সরে আসার দাবি জানিয়ে এসেছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনাে জোটে জড়িয়ে না পড়ার ব্যাপারে আমাদের বিঘােষিত সিদ্ধান্ত রয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ এবং বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত জনগণের যে সংগ্রাম চলছে- সে সংগ্রামে আমরা আমাদের সমর্থন জানিয়েছি। “কারাের প্রতি বিদ্বেষ নয়, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব"- এই নীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্টসমূহের সাথে আমরা শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানে বিশ্বাসী। আমরা মনে করি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া উচিত, এর মধ্যে আমাদের জনগণের বৃহত্তম স্বার্থ নিহিত রয়েছে। সেজন্য প্রতিবেশীদের মধ্যে বর্তমান বিরােধসমূহের নিষ্পত্তির উপর আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব আরােপ করি ।

দেশবাসী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হলেই এসব কর্মসূচি ও নীতিমালার বাস্তবায়ন সম্ভবপর। আগামী নির্বাচন জাতীয় মৌলিক সমস্যাসমূহ বিশেষ করে ৬ দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে গণভোেটরূপে আমরা গ্রহণ করেছি। রাজনৈতিক কারণে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিকের বিরুদ্ধে ও বিগত গণঅভ্যুত্থানকালীন দায়েরকৃত মামলা, গ্রেফতারি পরােয়ানা ও দণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করা হলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিনাবিচারে আটক সকল রাজবন্দীকেও মুক্তি দিতে হবে।

 

রাজনীতি ও সেনাবাহিনী

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের গুরুভার বহন করতে দেয়া কোনাে প্রকারেই উচিত নয়। রাজনীতিতেও সশস্ত্র বাহিনীর জড়িয়ে পড়া একেবারেই অনুচিত। উচ্চতর শিক্ষাপ্রাপ্ত পেশাদার সৈনিকদের জাতীর সীমানা রক্ষার গুরুদায়িত্ব এককভাবে পালন করা বাঞ্ছনীয়।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, জাতি হিসেবে আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ এসেছে- আমরা সাফল্যের সাথে তার মােকাবেলা করবই। প্রকৃত প্রাণবন্ত গণতন্ত্র দেশে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। যাদের নিয়ে পাকিস্তান গঠিত, তারা শুধুমাত্র একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যেই একত্রে বসবাস করতে পাবে।

গণতন্ত্র ধ্বংসের যেকোনাে উদ্যোগ পরিণতিতে পাকিস্তানকেই ধ্বংস করবে। আমাদের ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ফেডারেশনের ইউনিটসমূহকে পর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন মঞ্জুর করে অঞ্চলে অঞ্চলে সুবিচারের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এই ধরনের ফেডারেল গণতান্ত্রিক কাঠামাের আওতায় দেশে সামাজিক বিপ্লবের সূচনার জন্য প্রগতিশীল অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্ত বায়ন করতে হবে।

আওয়ামী লীগ এ চ্যালেঞ্জের মােকাবেলা করতে আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আওয়ামী লীগ দেশবাসীর যে সমর্থন ও আস্থার অধিকারী হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাস করি যে, ইনশাল্লাহ আমরা সাফল্যের সাথে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো।

 

(সাধারণ নির্বাচনের আগে, ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর বেতার-টেলিভিশনে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ)