স্বাধীনতার আগেই সমান্তরাল সরকার পরিচালনা

মার্চ মাস মানেই বসন্তকাল, ফাল্গুন ও চৈত্রের সমাহার। উড়ু উড়ু বাতাস, কোকিলের ডাকে আনমনা হয়ে থাকে মন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মার্চ ছিল ব্যতিক্রম। সেবারের বাতাস ছিল ভারী, কৃষ্ণচূড়ায় ছিল না কোকিলের কুহু তান। প্রতিটি রাজপথে বাঙালির তাজা রক্তে ফুটেছে শিমুল-পলাশ। মেঘে মেঘে বজ্র এঁকে দেশজুড়ে ছুটেছে উদ্ধত তর্জনীর ডাক। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর একটি জাতির চূড়ান্ত সময় ছিল এটি। ওই মার্চ মাস ছিল একইসঙ্গে সর্বোচ্চ ধৈর্য্য ধরে চূড়ান্ত পদক্ষেপের মহেন্দ্রকাল। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দেওয়া বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞার কাছে সেই বসন্তেই হার মেনেছে পাকিস্তানিদের কূটচাল। ফলাফল, ৯ মাস যুদ্ধের পর পৃথিবীর বুকে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ। বিগত দুই হাজার বছরে অনেকবার নিজস্ব রাষ্ট্র গড়তে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে যে জাতি, বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ ও পরাক্রমশালী নেতৃত্বে সফলকাম হলো সেই বাঙালি। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই মার্চের প্রতিটি দিন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একটু ভুল-ভাল হলেই হাজার বছরের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে একচেটিয়াভাবে জয় লাভ করার পরেও বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলো না পাকিস্তানিরা। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ স্বৈরাচার ইয়াইয়া যখন বেতারে ঘোষণা দিয়ে ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করে, তখন উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দেশব্যাপী ২ ও ৩ মার্চ হরতালের ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তার শাসক-শোষক গোষ্ঠীর হুকুমের বেড়াজাল ছেদ করে বাঙালি জাতি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয় অঘোষিতভাবে নিজেদের মতো করে নিজেদের জীবনব্যবস্থা পরিচালনার পথে নতুন যাত্রা। ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো। গড়ে ওঠে নতুন শাসনব্যবস্থা।  

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, 'আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাছারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালেল জন্য বন্ধ থাকবে। ...সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন।... যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে ততদিন খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না।'

 

লক্ষণীয় যে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে পূর্ব পাকিস্তান নয়, ‘বাংলাদেশ’ বলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ১ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাকিস্তান সরকার কিংবা মার্শাল ল’ কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশ কার্যকর হচ্ছিল না। জেলা, মহকুমা ও থানা প্রশাসন এবং পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী (গোয়েন্দা বিভাগসহ) চলছিল ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসা থেকে আসা নির্দেশ মোতাবেক। সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার অঙ্গীকার করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের শীর্ষ অফিসার এবং ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারাও একই পথে চলতে থাকেন।

 

এমন পরিস্থিতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন ১৫ মার্চ। বঙ্গবন্ধু তাকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নয়, ‘বাংলাদেশের অতিথি বা গেস্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সেসময় পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর ঢাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালেক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া ঢাকা বিমানবন্দর থেকে প্রেসিডেন্ট হাউসে কীভাবে যাবেন সেটা নিয়ে আলোচনার সময় ঢাকার বাঙালি পুলিশ সুপার আনন্দের সংবাদ দেন যে শেখ সাহেব 'টু অ্যাভয়েড এমবারেসমেন্ট টু হিজ গেস্ট', ফার্মগেট চেকপোস্ট অপসারণে সদয়সম্মতি প্রদর্শন করেছেন।’ আমরা জানি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অতিথি আসেন ভিন্ন রাষ্ট্র থেকে কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ এর মার্চেই পাকিস্তানকে ভিন্ন রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই গণ্য করেছেন।

 

ইয়াহিয়া খানের ঢাকায় আসার প্রাক্কালে সামরিক কর্তৃপক্ষ এমএলআর ১১৫ জারি করে অনুপস্থিত সকল সরকারি অফিসার ও কর্মচারীকে ১৫ মার্চের মধ্যে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। অন্যথায় কোর্ট মার্শাল করে কঠোর শাস্তি প্রদানের হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ এ নির্দেশ পালন করেনি। ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সর্বত্র বাংলাদেশ-এর পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানালে তা পালিত হয়। বঙ্গবন্ধু তার গাড়িতে এই পতাকা লাগিয়েই ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন।

 

অন্যদিকে, ১৫ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের নয়া নির্দেশাবলী ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে, যা ততদিনে ‘বাংলাদেশ-এর সচিবালয়ে’ পরিণত হয়েছে। এতে ছিল ৩৫টি নির্দেশ, যার প্রথমটি ছিল সরকারী সংস্থাসমূহের প্রতি, যাতে বলা হয়- 'নিম্নে বর্ণিত বিশেষ নির্দেশাবলী এবং বিভিন্ন সময়ে যেসব ছাড় ও ব্যাখ্যা দেওয়া হবে তা সবাই মেনে চলবেন’। তিন নম্বর নির্দেশ ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত, যাতে বলা হয় পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রয়োজনবোধে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সাথে যোগ দেবে। বন্দর, আমদানি বাণিজ্য, সড়ক ও রেলওয়ে, ডাক বিভাগ ও টেলিফোন বিভাগকে ৭ মার্চ থেকেই হরতালের আওতামুক্ত ঘোষণা করা হয়। অসহযোগ আন্দোলনের সময় এ সব প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করবে সেটা ৪ থেকে ১০ নম্বর নির্দেশে স্পষ্ট  করে বলা হয়।

 

১১ নম্বর নির্দেশে বলা হয়, বেতার- টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে গণআন্দোলন সম্পর্কিত বক্তব্য-বিবৃতি-সংবাদ প্রচার করা হবে। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ বিভাগগুলো কীভাবে কাজ করবে সেটা স্পষ্ট করার পাশাপাশি কৃষি খাত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণ কাজ যেন সচল থাকে সে জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২৫ ও ২৬ নম্বর নির্দেশ ছিল ব্যাংকিং কার্যক্রম সংক্রান্ত। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে কাজ করে, অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমরা সেই ভূমিকাই পালন করতে দেখি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘বিকল্প প্রশাসনকে’। ৩১ নম্বর নির্দেশে বলা হয়- কোনো খাজনা-ট্যাক্স আদায় করা যাবে না। তবে প্রাদেশিক সরকারের কর আদায় করা যাবে এবং ‘বাংলাদেশ সরকারের অ্যাকাউন্টে তা জমা দিতে হবে।’ এতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে কেন্দ্রীয় সরকারের পরোক্ষ কর আদায় করলেও তা কেন্দ্রীয় সরকারকে না দিয়ে ‘বাঙালি মালিকানাধীন ইস্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশন অথবা ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকে বিশেষ অ্যাকাউন্ট খুলে জমা করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সকল প্রত্যক্ষ কর (যেমন  আয়কর) আদায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

 

খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. জিল্লুর রহমান খান তার ‘বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি অসহযোগ আন্দোলনের  মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি লোকের জন্য একটি ডি-ফ্যাক্টো বা কার্যত সরকার গঠন করেছিলেন।...তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় এমন একজন অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন, যিনি যা চাইতেন জনগণ সেটাই করত।'

 

খাজনা-ট্যাক্স সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। ড. জিল্লুর রহমান খান ওই গ্রন্থে আরও লিখেছেন, ‘এ সময়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি পয়সাও কর প্রদান করেনি এবং কোনো প্রতিষ্ঠান তা করারও সাহস দেখায়নি। এমনকি ঢাকার দুই অভিজাত হোটেলও (ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও পূর্বানী) হোটেল ও বিনোদন কর আদায় বন্ধ করে দিলে সেখানের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য এত কমে যায় যে মধ্যবিত্তরাও সেখানে খেতে পারে। শেখ মুজিবুর রহমান পরবর্তী সময়ে নো-ট্যাক্স নির্দেশ সংশোধন করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো  বিভাগের পরিবর্তে বাঙালি মালিকানাধীন দুটি ব্যাংকে কর জমা দিতে বলেন এবং শিল্পপণ্য উৎপাদক, বিক্রেতা ও আমদানিকারকরা সে নির্দেশ পালন করে।’

 

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই অগ্নিঝরা আন্দোলনের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর বিকল্প সরকার প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাতেও অনন্য দক্ষতা প্রদর্শন করেন। এই অভিজ্ঞতা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে এ সরকার শপথগ্রহণ করে) যথাযথভাবে কাজে লাগাতে  পারে।

 

মূলত, মার্চের প্রথম দুপুর থেকেই এই আন্দোলনের সূচনা। প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে পাকিস্তানি হানাদারদের অসহেযোগিতা করার নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু জান্তারা সেই আন্দোলনে গুলি চালিয়ে শতাধিক মানুষের রক্তে রাজপথ রক্তাক্ত করে তোলে। ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোর অবস্থানের নির্দেশনা দেন বাঙালির সর্বোচ্চ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

 

প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এই ভূখণ্ডের সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনের একক নেতৃত্ব চলে আসে বঙ্গবন্ধুর হাতে। দ্বিতীয় সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই পুরো দেশ চলতে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে। বাস্তব অর্থে, শুধু সামরিক ছাউনিগুলো ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের সরকার ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধুই তখন বাংলাদেশের অঘোষিত রাষ্ট্রপ্রধান এবং ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি পরিণত হয় 'বিকল্প রাষ্ট্রপ্রধান'-এর সদর দফতরে। অবস্থা বেগতিক দেখে, পাকিস্তানি জান্তা ও রাজনীতিকরা ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে আলোচনার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন, কিন্তু দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের কার্যক্রমও গতিশীল রাখেন। পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রে পা না দিয়ে, সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিতে থাকেন বঙ্গবন্ধু। সেসসব নির্দেশ মেনে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে মুক্তির স্বপ্নে মগ্ন সাত কোটি জনতা। অবশেষে ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির ওপর আক্রমণ চালালে, বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু তার নামেই পরিচালিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধ।